এক অদ্ভুত সাধুর গল্প

 এক অদ্ভুত সাধুর গল্প

অন্যরকম সাধু দেখলাম জীবনে। একটা কাজে কেরালা গিয়েছিলাম। এর্নাকুলাম থেকে গাড়ি করে যাচ্ছিলাম পালাঘাট। রাস্তার দু'পাশে সবুজের সমারােহ। দেখতে-দেখতে আনন্দে মন ভরে যায়। হঠাৎ দেখি রাস্তায় একজন সাধু বুড়াে আঙুল তুলে লিফট চাইছেন। আগে কখনাে এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। মিঃ নায়ার নিজেই ড্রাইভ  করছিলেন। গাড়ি থামিয়ে ঐ সাধুকে তুলে নিলেন।

নাম তাম্পি স্বামী। গেরুয়া কাপড় পরা। গায়ে ধুতি আর চাদর। সঙ্গে একটা কাপড়ের পুঁটলি। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। গল্প করতে করতে জানা গেল তিনি একসময়ে রামকৃষ্ণ মিশনে যােগ দিয়েছিলেন। বছর দেড়েক পর বাবা মারা যাওয়ায় বিধবা মা ও দুই ছােট ভাই-বােন অসহায় হয়ে পড়ে। তখন মিশন-কর্তৃপক্ষ তাকে ফিরে যেতে বলেন সংসারের হাল ধরতে। বলেছিলেন, ঘরে থেকেই তুমি সাধনা করাে, মঠ-মিশনের সঙ্গে যােগাযােগ রেখাে।

তাঁর বর্তমান জীবন বৈচিত্র্যময়। ভাই-বােনেরা দাঁড়িয়ে গেছে। তিনি থাকেন বৃদ্ধা মার সঙ্গে। বছরে ৯মাস তিনি মিঃ কেশবন্ হয়ে চাকরি করেন একটা কোম্পানীতে। আর ৩ মাস তাম্পিস্বামী নামে ঘুরে বেড়ান। পাহাড়ে-জঙ্গলে তপস্যা করেন। বিয়ে করেন নি। কোম্পানীর কোয়ার্টার্সে থাকেন। ঘরে গেরুয়া পরেন, কারখানায় যান সাদা পােশাকে। ম্যানেজারের চাকরি। নিয়মিত বেতন নেন। আর যখন তাম্পি  স্বামী হয়ে বেড়িয়ে পড়েন, সঙ্গে টাকা-পয়সা রাখেন না। আকর্ষণীয় চরিত্র তার। বেশ মজার মানুষ।

 তাঁকে  প্রশ্ন করলাম—একটানা তিনমাস ছুটি দিতে কোম্পানী আপত্তি করে না? তিনি বললেনঃ কেউ-কেউ করে। গত ১২ বছরে ৫ বার কোম্পানী বদলেছি এজন্য। বর্তমান মালিক খুবই সদাশয়। তাছাড়া আমি তাে ক্যাজুয়েল-মেডিক্যাল লীভ নিই না। আর ইন্টারভিউর সময় আমি এই শর্তের কথা বলে রাখি। পরিষ্কার বলে দিই যে মহিলারা যদি মেটার্নিটি  লীভ পেতে পারেন, 
আমাকেও তেমনি স্পিরিচুয়্যাল লীভ দিতে হবে।

পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালেও তাম্পি স্বামী পছন্দমতাে জায়গা পেলে ওখানেই কাটিয়ে দেন কয়েক দিন বা সপ্তাহ। ভক্তিপথের সাধক। আদ্যাশক্তির উপাসক। ধ্যান করতে বসে অনেকক্ষণ মনে-মনে কথা বলেন ভগবানের সাথে। এরপর অনুভব করার চেষ্টা করেন যে চারপাশের গাছ-নদী-পাহাড়-মানুষ-কুকুর সবকিছুর  মধ্যেই মা আদ্যাশক্তি আছেন। অনেকক্ষণ এভাবে থাকেন।
জিজ্ঞেস করলাম—আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন। সাধন-ভজন করে কি পেলেন?

ভয় কেটে গেছে-তাম্পিস্বামীর উত্তর—নিরাপত্তার চাহিদা, অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা, কোথায় থাকবাে, কি খাবাে এ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা, এ সব আর আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে না। মনে আনন্দ নিয়ে 
ঘুরে বেড়াই। কে কি বলবে, সমাজ কি মনে করবে, এসব নিয়েও ভয় নেই। মুক্ত মানুষের মতাে পথে চলি। লজ্জাও অনেক দূর হয়ে গেছে। কাপড় খুলে ফেলে উলঙ্গ হয়ে বাজারে যেতে পারি। কিন্তু যখন অফিসে কাজ করেন? আপনার চাকরি জীবনে? কাউকে ভয় পাই না। যে-কোনাে সময়ে চাকরি ছেড়ে দেয়ার সাহস 
আছে। আর এটা আছে বলেই ভয় বা লােভ আমাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না মােক্ষ, নির্বাণ অনেক বড় কথা। দৈনন্দিনের সীমাবদ্ধতা থেকে মানুষ আগে মুক্ত হোক। 

প্রশ্ন করি—আপনি তাে মাতৃ-উপাসক। মায়ের দেখা পেয়েছেন কখনাে? রামকৃষ্ণ পরমহংসের মতাে দিব্যদর্শন আমার হয়নি। তবে এমন বহুবার হয়েছে, অনুভব হয়েছে যে মা আমাকে দেখছেন। রাস্তা দিয়ে চলেছি। উল্টোদিক থেকে একটি মেয়ে হেঁটে আসছে। 
তার চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছে। এমন দৃষ্টি তাে মানুষের হয় না! শহরে বাড়ি তৈরী হচ্ছে। এক মহিলা মজুর মাথায় ইট নিয়ে যেতে যেতে আমার দিকে তাকালাে। স্পষ্ট দেখতে পেলাম, তার দুই চোখের মাঝখানে কপালে তৃতীয় নয়ন। এমন ঘটনা জীবনে বহুবার ঘটেছে। এখনাে ঘটে। একটা স্কুলের  সামনে বাচ্চা  মেয়েরা খেলছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম। হঠাৎ মনের মধ্যে এক তীব্র অনুভূতি-মা তার আটজন সখী নিয়ে খেলছেন।একটি মেয়ে আমার দিকে তাকালাে। আয়ত নয়ন। কালাে চোখ। আলাের দীপ্তি। এমন দৃষ্টি মানুষের নয়।

কিন্তু এ তাে আপনার মনের কল্পনা হতে পারে! 
জগৎ-সংসার তাে কল্পনারই খেলা। প্রেমিকের সৌন্দর্য, আকাশের রামধনু, শিশুর সারল্য , চাকরি জীবনের নিরাপত্তা সবই তাে কল্পনা। প্রশ্ন হলাে, কল্পনার ফল কি? মানুষকে এটি উন্নত করছে, অথবা নীচে নামাচ্ছে? মানুষের মন অধিকাংশ সময় কল্পনায় ব্যস্ত। কল্পনাই তাে মানুষকে ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু যে কল্পনার পরিণতি  মানসিক উন্নতি, সেটাই পজিটিভ কল্পনা।। 

একটা জায়গায় মিঃ নায়ার গাড়ি থামালেন। বললেন, চলুন কিছু খাওয়া যাক। সুন্দর পরিবেশ। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। সবুজে ঢাকা চারদিক। এদিকে ওদিকে কয়েকটা ছােট বাড়ি। আমরা যেখানে থামলাম, সেখানে একটা বাস স্টপ। একটা ছােট গ্রাম। বাসস্টপের পাশে মুদির দোকান। পাশে ছােট রেস্টুরেন্ট । আমরা তিনজন সেখানে ঢুকে চেয়ার নিয়ে বসলাম। আরও ৭-৮ জন মানুষ বসে খাচ্ছে। মেদুবড়া ও কফির অর্ডার দেয়া হলাে। গেরুয়া পরা ২ জন সাধু রেস্টুরেন্টে খেতে এসেছে, এটা অনেকেই তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে। একজন সাধুর মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি, জামা-কাপড় একটু ময়লা, পায়ে জুতাে নেই। অন্যজনের হাতে ঘড়ি, পরিষ্কারভাবে কামানাে গাল, চোখে চশমা, পায়ে চপ্পল। পার্থক্যটা সহজেই চোখে পড়ে। দুজনই ইংরেজিতে কথা বলছে। দেখার মতাে দৃশ্য বটে। গ্রাহক, ওয়েটার, এমনকি ক্যাশিয়ারও অবাক হয়ে দেখছে। কেউ সরাসরি, কেউ-বা আড়চোখে। ব্যাপারটা কি তা বােঝার চেষ্টা করছে।

 তাম্পিস্বামীর নজর এড়ালাে না। হেসে বললেন : কেরালায় কম্যুনিস্ট-আধিপত্য। শিক্ষিতের হার সর্বোচ্চ। কিন্তু চরিত্র একইরকম থেকে গেছে। সন্ন্যাসীদের সম্বন্ধে এদের ধারণা আগের মতােই। লম্বা চুল ও দাড়ি, খালি পা, ময়লা ধুতি-চাদর, অশিক্ষিত, সঙ্গে কমণ্ডলু-তবেই সাধু। একটু অন্যরকম হলেই ঘাবড়ে যায়। কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলতে পারলে সেই সাধুর খাতির বেশি। 

মিঃ নায়ার ও আমি হাে-হো করে হেসে উঠলাম। তাম্পিস্বামী বলতে থাকেন  হ্যাঁ মশাই, এদের ধারণা।চাকর-বাকরী পায়নি বলে সন্ন্যাসী হয়েছে। এই যে আপনি-আমি ইংরেজী বলছি এতে ওরা অবাক হয়ে গেছে। শিক্ষিত, অথচ সাধু হলাে কেন? নিশ্চয়ই প্রেম করে আঘাত পেয়েছে। তাই মনের দুঃখে সাধু হয়ে গেছে।
আমরা তিনজনই উচ্চস্বরে হাসতে লাগলাম।

তাম্পিস্বামীর কথা শুনে  অন্য গ্রাহকেরা চোখ নামিয়ে গভীর মনােযােগের সাথে খেয়ে যেতে লাগলাে।তাম্পিস্বামীর ইংরেজিতে মন্তব্য অনেকেই 
বুঝতে পেরেছে।ওয়েটার মেদুবড়া নিয়ে এলাে। ঠাণ্ডা। তাম্পিস্বামী তাকে ধমকালেন নতুন করে গরম বড়া তৈরী করে আনতে বললেন। উঠে গিয়ে কাউন্টার থেকে একটা কেক-প্যাকেট নিয়ে এলেন। বড়া যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ এটাই চলুক—বলে নিজেই প্যাকেট খুলে 
আমাদের দিলেন। রেস্টুরেন্টের গ্রাহকেরা গােল গােল চোখে তাকিয়ে আছে। কেক তৈরী করতে ডিম দরকার হয়। সাধুরা কেক খাচ্ছে দেখে তারা খুব অবাক।

তাম্পিস্বামী আয়েস করে খাচ্ছেন, আর মন্তব্য করছেন—এদের ধারণা সাধুরা শুধু জল আর হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকে। কিংবা বড় জোর ফল আর দুধ। সাধু ডিম খায় জানলে ঘাবড়ে যায়। আমার মাঝেমাঝে ইচ্ছা হয়, দেখিয়ে দেখিয়ে চিলি-চিকেন খাই এদের মধ্যে।

মিঃ নায়ার নার্ভাস। তাম্পিস্বামী থামবেন না। বেপরােয়া মনােভাব। বললেন—আমাদের কোম্পানীর মালিক মারা গেছেন। ছেলে কট্টর কমিউনিস্ট।  শ্রাদ্ধ করলাে না। শুধু স্মৃতিসভা। সভার প্রথমেই দাঁড়িয়ে ২ মিনিট নীরবতা পালন। আমি আপত্তি করলাম। শােকপ্রকাশ করতে হলে দাঁড়াতে হবে কেন? বসে-বসে কেন করা যাবে না? অন্যান্য কোম্পানীর মতাে আমাদের এখানেও কিছু 
চামচা আছে। একজন এসে আমায় বােঝাতে শুরু করলে তাকে দাবড়ে দিলাম।  দাঁড়িয়ে শােকপ্রকাশ করা এক অন্ধবিশ্বাস। আমি শুয়ে-শুয়ে শােকপ্রকাশ করলে আপনার আপত্তি কি?

মশাই, আপনি তাে কালাপাহাড়—বললাম তাম্পিস্বামীকে। তিনি হাসলেন : কেউ বাঁদরামাে করলে আমি কালাপাহাড় হয়ে যাই। এজন্য  রেশনালিস্টরাও খাপ্পা আমার উপর। শবরীমালা মন্দিরে হিন্দু মেয়েদের অধিকার দিতে হবে বলে আন্দোলন করে ছিলাম 
ওদের সাথে । এরপর যখন বললাম যে এবারে মসজিদে 
মুসলমান মেয়েদের নামাজ নামাজ পড়ার অধিকার নিয়ে আন্দোলন করতে হবে, তখন রেশনালিস্টরা  পিছিয়ে গিয়েছিল। এজন্য প্রকাশ্যে এদের ধান্দাবাজ বলেছিলাম। এই নিয়ে হৈ-চৈ।।

সময় হয়ে এসেছে। বিদায় নেয়ার পালা। আমার হাত দুটো ধরে তাম্পিস্বামী বললেন : খুব ভাল কাটলাে সময়টা। মনের মতাে মানুষ তাে সহজে পাওয়া যায় না। তাই আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব আনন্দ পেলাম। জীবনে আর কখনাে দেখা হবে কি না 
জানিনা। আপনিও হয়তাে আমায় ভুলে যাবেন। না না ভুলবাে কেন? আমারও খুব ভাল লেগেছে আপনার সঙ্গে মিশে, আপনার কথা জানতে পেরে। বৈচিত্র্যময় জীবন আপনার। একদিন আপনিও হয়তাে চাকরি ছেড়ে পুরােপুরি পরিব্রাজক জীবন বেছে নেবেন। 
আপনার কথা আমি ভুলবাে না। ভােলা যায় না।
মিঃ নায়ার গাড়ি স্টার্ট দিলেন। তাম্পিস্বামী এখান থেকেই জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যাবেন। থাকবেন এখানে কয়েকদিন।শেষবারের মতাে নমস্কার। গাড়ি চলতে শুরু করলাে। পেছনে তাকিয়ে দেখি তাম্পিস্বামী হাত নেড়ে যাচ্ছেন তখনও। দূর থেকে আমিও হাত নাড়লাম। তাম্পিস্বামী আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছেন দূরে।

তথ্য :
আমার সন্ন্যাস জীবন ও বেলুড় মঠ

লেখক: স্বামী সোমেশ্বরানন্দ

Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির

শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )