শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )


শ্রীরামপুর এর ইতিহাস -

পুরীর রথযাত্রার পরেই সবার আগে যে জায়গাটির নাম আমাদের মাথায় আসে তা হলো শ্রীরামপুর ।

           শ্রীরামপুর পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর ডানতীরে অবস্থিত । কয়েক শত বছরের পুরনো এই শহরটি । শ্রীরামপুর নগরায়নে তিনটি ধারা দেখতে পাই - ১) প্রাক নগরায়ণ কাল ( ১৭৫৫ খ্রি পূর্ববর্তী অবস্থা ) , ২ ) নগরায়ন কাল (১৭৫৫ - ১৮৪৫ খ্রি ) এবং ৩) শিল্পায়ন কাল ( ১৮৪৫ - ১৯৪৭ খ্রি ) ।

১) প্রাক নগরায়ণ কাল -
                মুগল আমলের বহু আগে থেকেই সরস্বতী ও হুগলি নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলটি ছিল বর্ধিষ্ণু জনপদ । পনেরো শতকে লেখা বিপ্রদাস পিপলাই - এর মনসা মঙ্গল কাব্যে আকনা ও মাহেশ নামের উল্লেখ রয়েছে । শ্রী চৈতন্যের সমকালীন পুঁথিতে এই দুটি নাম ছাড়াও চাতরার উল্লেখ পাওয়া যায়। টেভার্নিয়ার - এর ভ্রমণবৃত্তান্তে মাহেশের রথযাত্রার বিবরণ রয়েছে । হিন্দু দেব - দেবীর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনও শ্রীরামপুরে দেখা যায়।যেমন - বল্লভপুরে হেনরী মার্টিন প্যাগোডা , রাধাবল্লভজীউর মন্দির ( আঠারো শতক ), চাতরার গৌরাঙ্গ মন্দির , রামসীতার মন্দির ,মাহেশের জগন্নাথ মন্দির ( ১৭৫৫ খ্রি ), গোস্বামী পাড়ার শিব মন্দির প্রভৃতি । আবুল ফজলের আইন - ই - আকবরী গ্রন্থে রাজা মানসিংহের পূর্ব - ভারতে আগমন (১৫৮৯ - ৯০ খ্রি) এবং শ্রীপুরে শিবির স্থাপনের বৃত্তান্ত থেকে এবং আবদুল হামিদ লাহোরির বাদশাহ নামায় শ্রীপুর কে শ্রীরামপুর নামে চিহ্নিত করণ থেকে অনুমান করা যায় যে , মুগল আমলের আগে থেকেই উল্লেখিত স্থান গুলো প্রসিদ্ধ ছিল । পনেরো শতকে চৈতন্য দেবের বৈষ্ণব বাদের প্রভাবে এখানকার কয়েকটি স্থান হিন্দুদের  তীর্থক্ষেত্র হয়ে ওঠে। শেওড়াফুলির রাজা মনোহরচন্দ্র রায় ১৭৫২ সালে শ্রীপুরে রামসীতার মন্দির স্থাপন করার পর তাঁর পুত্র রামচন্দ্র দেব সেবার জন্য শ্রীপুর , গোপীনাথপুর ও মনোহরপুর নামক তিনটি মৌজা গাঙ্গুলীদের নামে দেবোত্তর করে দেন । এভাবে ' ' শ্রীপুর ' , ' শ্রীরাম ' নাম থেকে ' শ্রীরামপুর ' নামটির উৎপত্তি হয়েছে।দেবপূজা ও মন্দিরের নানাবিধ  কাজে কর্মে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষজনের প্রয়োজন হওয়ায় চাকরান জমিতে এসে তারা বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। এভাবে সৃষ্টি হয় পটুয়াপাড়া , কুমোরপাড়া , ঢুলিপাড়া , গোয়ালপাড়া ইত্যাদি। শেওড়াফুলি গড়ে উঠেছিল বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে এবং সেখানে ১৭৫৫ - র আগে থেকেই বরুজীবী, দত্ত ও দে'রা বসতি স্থাপন করে ছিল । চাষিরা গড়ে তোলে সদগোপপাড়া , মান্না পাড়া ,লঙ্কাবাগান প্রভৃতি অঞ্চল । জেলে - কৈবর্ত,শানি মুচিরা এসে স্ব স্ব পল্লী গড়ে তোলে ।মল্লিকপাড়ায় সুন্নি সম্প্রদায়ের মুসলমানরা বসবাস শুরু করেন।এরা মুগল সৈন্যদের বংশধর । এখানে একটি মসজিদ আজও তাদের অবস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।


মুগল আমলে আকনা ও মাহেশে ঘন জনবসতি ছিল। এখানকার জলবায়ু ছিল উষ্ণ ও আর্দ্র , যা বয়ন শিল্পের পক্ষে ছিল বেশ অনুকূল।এ কারণে এসব অঞ্চলে সুতিবস্ত্র আর রেশমবস্ত্র তৈরি হতো। হিন্দু তাঁতিরা বুনত উন্নত মানের সুতিবস্ত্র আর মুসলমান তাঁতিদের প্রাধান্য ছিল রেশমবস্ত্রে। উর্বর অঞ্চলে ফলত ধান , পাট ও পান। জেলে - কৈবর্তরা খাল বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত।
         প্রাক-নগরায়ণকালে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল প্রধানতঃ নদী পথ। এছাড়া বাদশাহী সড়ক বা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডও ব্যবহৃত হতো।দিনেমারদের আসার আগেই এ অঞ্চলের প্রধান অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল শেওড়াফুলি হাট। পূর্ব বাংলার ( বর্তমান বাংলাদেশ ) বরিশাল, খুলনা,ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী প্রভৃতি জেলার সঙ্গে এর বাণিজ্যিক সংযোগ ছিল।চোদ্দ থেকে আঠারো শতক পর্যন্ত ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ প্রভৃতি বিদেশী বণিক দল এ অঞ্চলে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত হয়।সে সময় হুগলি ও সরস্বতী নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল ছিল শেওড়াফুলি ও অন্যান্য জমিদার দের অধীন। এই সকল সামন্ত-প্রভুগণ প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা পেতেন। তাঁরা ছিলেন একাধারে প্রজাপীড়ক ও দন্ডমুন্ডের মালিক। কিন্তু ইউরোপীয় বণিকদের আগমন ও ক্রমশ এই সব অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে জমিদারদের প্রতাপ ম্লান হয়।যে সকল স্থান হিন্দুতীর্থ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল, সেখানে নগরায়ণের প্রাথমিক লক্ষণগুলো পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।

সংগৃহীত
কলমে - স্বপ্না ব্যানার্জী
( চলবে )

Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির