কবিগুরুর স্মৃতিচারণ

কবি গুরুর স্বতঃস্ফূর্ত ও নিজের মুখে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া স্মৃতিচারণ ।

এরকম খাবার আর বানিও না , বউমা । মিষ্টির বাটিটা পাশে সরিয়ে রাখলেন রবীন্দ্রনাথ । তারপর আস্তে আস্তে উঠে গেলেন খাবার টেবিল থেকে ।

হেমলতাদেবী কি বলবেন বুঝতে পারলেন না । এতদিন পরেও ! ঠিক ধরে ফেলেছেন ।

ইদানীং দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পরে সামান্য সময় বিশ্রাম নেওয়াটা অভ্যেস হয়েছে রবীন্দ্রনাথের । আগে ছিল না । সত্তর বছর বয়েসে বউমা আর নাতবৌমাদের পাল্লায় পড়ে এই নতুন বন্দোবস্ত । প্রথমে একটু কেমন কেমন লাগত । এখন অবশ্য ভালই লাগে ।

আজও একটু চোখ বুজে বিশ্রাম নিলেন । বেশী না , পনের কুড়ি মিনিট পরেই অবশ্য চটকাটা ভেঙে গেল ।

আরে , একি । বউমা । তুমি কখন এলে ? পায়ের কাছে বসে কেন ?

হেমলতাদেবী চোখ তুলে তাকালেন । আমায় ক্ষমা করুন , দাদামশাই !

আরে , না না । কি বলছ বউমা । আমারই উচিত হয় নি তখন অতটা ইমোশনাল হয়ে পড়াটা । বুডো হয়েছি তো ! কিছু মনে কোরো না, হ্যাঁ ?

মনে করব না যদি আপনি যে গল্পটা অনেকদিন ধরে বলব বলব করছেন, কিন্তু বলছেন না - সেটা যদি বলেন । একগাল হেসে বললেন হেমলতা দেবী ।

সম্পর্কে তিনি রবীন্দ্রনাথের দাদার নাতবৌ । আর স্বভাবে হাসিখুশি প্রকৃতির । বেশীক্ষণ মুখ গোমড়া করে থাকা তার পোষায় না ।

কোন গল্পটা বলোতো ? দুষ্টু হেসে জিজ্ঞাসা করলেন রবীন্দ্রনাথ । যদিও তার ভালোই মনে আছে কোন গল্পটা ।

কোনটা আবার ? আপনাদের বিয়ের গল্পটা । আমার দিদিশাশুডির গল্পটা ।

ও । ওইটে । সে ত অনেকদিন আগের কথা । সব মনে নেই ।

না । মনে নেই বল্লে শুনব কেন ? খাবার টেস্ট করেই ধরে ফেললেন । মনে নেই বললেই হল ?

হেসে ফেললেন রবীন্দ্রনাথ । সত্যি । তুমি ছোট বউয়ের রেসিপিটা পেলে কোথা থেকে বলোতো ? অবিকল বানিয়েছ !

ওমা আপনি জানেন না ? ওনার রেসিপি লেখা খাতাটা তো আমাদের কাছেই থাকে !

বাহ্ । তাই ত বলি ! তাই তুমি কদিন ধরে বলছিলে আমাকে একটা খাবার খাইয়ে চমকে দেবে ! তা আগে করো নি তো ! আজ কি ব্যাপার ?

আপনার কিচ্ছু মনে থাকে না দাদামশাই । আজই ত আপনাদের বিবাহবার্ষিকী !

অ্যাঁ, আজ ! আরে তাই ত । আজই তো চব্বিশে অঘ্রাণ ! নাহ্ । সত্যি, কিছু মনে থাকে না ।

রবীন্দ্রনাথ একটু উদাস হয়ে গেলেন ।

ইস। কি করে আজকের দিনটা ভুলে গেলেন !

মেমারিটা একেবারে গেছে । অবশ্য মেমারির আর দোষ কি ! একি আজকের কথা । ছোটবউ তো চলেই গেছে আজ থেকে তিরিশ বছর আগে । তখন ও ঊনত্রিশ আর রবীন্দ্রনাথ একচল্লিশ । একসঙ্গে ছিলেন মাত্রই ঊনিশ বছর ।

মাত্র ঊনিশ ?

আবার কি ? আসলে আরো কম । বিয়ের সময়ে ওর বয়স কত আর - নয় কি দশ ! তখন তো আর আমার কাছে থাকত না ! বিয়ের পর তখন তো সবাই আবার বাপের বাড়ি চলে যেত । যদিও ওদের বাপের বাডি গরীব ছিল বলে বাবামশাই বউমাকে আর বাপের বাড়ি পাঠান নি । জোড়াসাঁকোতেই রেখে ট্রেনিং চলছিল । লোরেটোয় ইংরেজি শিখতে যেত, বাড়িতে সংস্কৃত টিচার রাখা হয়েছিল ।

আমি একটা কথা জিগ্যেস করব, কিছু মনে করবেন না ?

বলো না । মনে করব কেন ? অনেকদিন কেউ এসব জিগ্যেস করে নি । ভালই লাগছে বলতে ।

আমি শুনেছি খুব সাধারণ ফ্যামিলি থেকে এসেছিলেন ? দেখতে শুনতেও .....

অতি সাধারণ ছিল, তাই তো ?

আসলে জান তো আমাদের বাডিতে ফরসা রং, সুন্দরী এসব গুলোকে খুব প্রাধান্য দেওয়া হত । মানুষটা কেমন - সে কথা যেন ভাবতই না । আমার বউদিরা ত বিরাট হতাশ হয়েছিল । এই নাকি রবির বউ !

তাহলে বিয়েটা হল কেন ?

সে অনেক কথা । আমরা ত পিরালির ব্রাহ্মণ ! অরিজিনাল টাইটেল কুশারী । সেই কবে মুসলমানের হাতের ভাত খেয়েছিল বলে বর্ণহিন্দুরা কেউ আমাদের ঘরে মেয়ে দিতে চাইত না । ফলে আমাদের বউয়েরা সব যশোর থেকেই আসত । আর মজাটা কি জান ? গায়ের রং নিয়ে বউদিদের এত চিন্তা, অথচ আমার বউদিরা কিন্তু প্রায় সবাই আমার দাদাদের থেকে কালো ! তবুও বিয়ের কয়েকদিন পরে তাঁরাই এসব ভুলে রবির বউয়ের গায়ের রং কেন চাপা সেই নিয়ে......

হি হি । সে অবশ্য সত্যি কথা । আমরা যারা ঠাকুর পরিবারের বউ তারা কেউই আপনাদের বাড়ির ছেলেদের নখের যোগ্য নই !

না না । ওরকম বোলো না । মানুষের গায়ের রং কি মানুষের পরিচয় ? তার গুণটাই আসল ।

সে যাকগে । তারপর ? হেমলতা দেবী তাডা লাগালেন । একটু পরেই বিকেল হবে । আর লোকের লাইন পড়ে যাবে কবির সঙ্গে দেখা করার জন্য । ব্যাস্ । গল্পটা মাঠে মারা যাবে ।

তো, বুঝলে ? কানাঘুষো শুনে আমারও মনটা কেমন কেমন করছিল । তখন আমার বয়স বাইশ । মন তো রোমান্সে থই থই । কিন্তু কি আর করবো ? খবর নিতে লাগলাম । মেয়ের ভাল নাম ভবতারিণী । ডাকনাম দুটো - পদ্ম আর ফুলি ।

এ মা । এরকম নাম ?

আরে তা তো হবেই । ওর বাবা ত আমাদেরই ছোট গোমস্তা । তার মেয়ের আবার কি নাম হবে ? রবীন্দ্রনাথ মুচকি হেসে বলেন । তো , নাম চেন্জ করা হল । পদ্মের পরিবর্তে মৃণালিনী ।

ও ।

তো , বিয়ের দিন আমার মনেও খুব একটা আনন্দ নেই । কিন্তু বাইরে সেটা প্রকাশ করছি না । উল্টে জোরসে ইয়ারকি করছি । একজন বয়োজ্যেষ্ঠ তো একটু বকাই দিলেন । তবে বিয়ের সময় শ্বশুর মশাই আর বউকে দেখে বড় মায়া হল, জান ?

মায়া ?

হ্যাঁ । দেখি দুজনেই কিরকম জড়সড় হয়ে বসে আছে । প্রতিটা নড়াচড়ার মধ্যই যেন তাদের হীনন্মন্যতা ফুটে উঠছে । না, মানে এমন নয় যে আমার বাড়ির লোকেরা তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে । কিন্তু , তারা নিজেরাই .....

হেমলতা দেবী চুপ করে শুনতে থাকলেন ।

দেখে না বড্ড মন কেমন লাগল । মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম এই অতি সাধারণ মেয়েটিকেই আমি সারাজীবন খুব ভালবাসবো ।

তারপর ?

দুর ! দুঃখের কথা আর কি বলবো ? ভালবাসব কি ? কাছেই ত পাই না । সারাদিন তার 'ট্রেনিং' চলছে । রাতে শোওয়া সব দূর সম্পর্কের আত্মীয়াদের কাছে । এই ভাবে কেটে গেল দু তিন বছর । তারপর একদিন দুপুরবেলা হঠাৎ বাড়ি ফিরে এসেছি । গরমকাল । পরনের পিরানটা খুলেছি, হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে দেখি টুংটাং শব্দ । কি ব্যাপার ? দেখি ছোটবউ । অনেকদিন কাছ থেকে দেখিনি । তাই প্রথমবারে চিনতে পারি নি । বেশ লম্বা হয়ে গেছে । চেহারাটাও বেশ ভাল হয়ে গেছে । মজা করার ইচ্ছে হল । চোখ পাকিয়ে ডাকলাম ।

তারপর কি হল ? হেমলতা নড়ে চডে বসলেন ।

আর বোলো না । কিছুতে কাছে আসবে না ! অতি কষ্টে পাশে বসালাম । জিগ্যেস করলাম - কি ব্যাপার ? এখন আমার ঘরে কেন ? বলল ও নাকি প্রায় দুপুরবেলা সুযোগ পেলেই আমার ঘর গোছাতে চলে আসে । তাছাড়া এখন তো গরমের ছুটি পড়ে গেছে । কি মনে হল কাছে টেনে নিলাম । বললাম এইবার ? না বলে আমার ঘরে ঢোকার শাস্তি জান ?

হেমলতা মুচকি হেসে বললেন - এবার কি হল আমি বুঝে গেছি ।

আরে না রে মেয়ে, তুমি যা ভাবছ তা নয় । কিছুই হল না । হাঁচড় পাঁচড় করে পালিয়েই গেল । তবে যাবার আগে বলে গেল - এবার থেকে রোজই আসবে যদি আমিও রোজ এসময় আসি ।

আপনি আসতেন ?

আসব না ? গিন্নির হুকুম বলে কথা ! স্মিত হেসে বললেন রবীন্দ্রনাথ । রোজ আসতুম । বেশ চলছিল, বুঝলে ? ওর একটা নামও দিলাম । ছুটির সময়ে ঘনিষ্ঠতা । তাই নাম রাখলাম - ছুটি । কয়েকদিন পর ওর লজ্জাটাও কেটে গেল । আমার কাছেই বসত । তো, এরকমই একদিন গল্প করছি । সেদিন একটু মনটা খারাপ।

কেন। মন খারাপ কেন ? হেমলতা জিজ্ঞাসা করলেন ।

পরের দিন থেকে ইস্কুল খুলে যাচ্ছে তো ! আর এভাবে দেখা হবে না । সেটা নিয়েই একটু কথাবার্তা হচ্ছে । এমন সময় , আমরা গল্প করতে এমনি মশগুল, খেয়ালই করিনি আমার এক বৌদি আমাদের গল্প করতে দেখে ফেলেছে । আর যায় কোথায় । সারা বাড়ি সেটা রাষ্ট্র করেছে ।

তারপর ?

তারপর আর কি ? শাস্তি পেতেই হল ।

শাস্তি ! কি শাস্তি ? হব

আবার কি ? দুপুরবেলা এভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা সাক্ষাত বন্ধ ।

ইস ।

ইস বলে ইস । দুপুরে এভাবে দেখা করা যাবে না । তবে, ....

তবে ?

তবে এবার থেকে রাত্রে দেখা করা যাবে কারণ এবার থেকে ছোটবউ আমার কাছে থাকতে পারবে ।

ওহ্ । কি মজা । হাততালি দিয়ে উঠলেন হেমলতা দেবী ।

নাত বউমার ছেলেমানুষি দেখে বেশ জোরেই হেসে ফেললেন কবি ।

হেমলতা এবার একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন । তবু জিগ্যেস করলেন , তারপর ?

তারপর আর কি ? কিছুদিন পরে ছুটির কোল আলো করে এল আমার বড় মেয়ে বেলা । আর তার কিছুদিন পরেই জমিদারি দেখাশোনার জন্য সপরিবার চলে গেলাম গাজিপুর ।

গাজিপুর না শিলাইদহ ?

আরে, ঐ গাজিপুর বাসের পরিণতিই হল শিলাইদহে ।

শুনেছি, সে নাকি খুব সুন্দর জায়গা ?

সুন্দর বলে সুন্দর ? বাংলাদেশের মত সুন্দর পৃথিবীতে কোথাও আছে নাকি ? আর এই শিলাইদহে গিয়ে আমারও লেখার হাত খুলে গেল আর তোমার দিদিশাশুড়িকেও যেন নতুন করে চিনলাম ।

নতুন করে ?

হ্যাঁ, নতুন করে । আসলে কি জান , এখানে তো বাড়ির ছোট বউ ! আর ওখানে তো ও-ই সর্বময় কর্ত্রী ! ওর গুণগুলো যেন শিলাইদহে পাখনা মেলে দিল । ছোট বউয়ের রান্নার হাত তো বরাবরই ভাল, ওখানে গিয়ে আরো সরেস হয়ে গেল । কত উদ্ভট আব্দার করতুম । সব বানিয়ে খাওয়াতো ।

কিরকম ?

যেমন ধরো দইয়ের মালপো ।

দইয়ের মালপো ?

এরকম খাবারও হয় নাকি ! ঐ খাতাটাতে এটা লেখা নেই তো !

কেন লেখা নেই আমি কি করে বলব ? তারপর ধরো পাকা আমের মিঠাই, চিঁড়ের পোলাও, কচুর পিঠে ।

এ বাবা । হেমলতা কলকল করে উঠলেন, এগুলো একটাও লেখা নেই । কি হবে ?

কি আবার হবে ? কিছু হবে না । তোমার রান্নার হাতও ভারি চমৎকার । তুমি যেমন রাঁধ, তেমনি রাঁধবে । তো, যা বলছিলাম । এ তো গেল রান্নার কথা । মানুষকে ভালবাসার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল ছোটবউয়ের । আমি ছিলাম জমিদার । ফলে আমার সঙ্গে সব প্রজাদের ঠিক বনত না । কিন্তু ছোটবউ হয়ে গেল সব প্রজাদেরই মা । রোজই বাডিতে একগাদা পাত পড়ত । সময় নেই অসময় নেই প্রজারা হাজির । কারোর খাজনা মকুব করতে হবে । কারোর মাইনে একটু বাড়ানো দরকার । রাস্তা সারাইয়ের টাকা লাগবে । একবার আব্দার হলেই হল । সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে হাজির । তোমার দিদিশাশুড়ির মুদ্রাদোষ ছিল- 'এই শুনছো'- বলা । এই শুনছো - অমুকের মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না । ওকে কিছু টাকা দিতেই হবে । এই শুনছ, তমুকের বাড়ির চাল ঝড়ে উড়ে গেছে । ওকে একটু সাহায্য করো না !

ইস । কি ভাল মন !

আর ভালো মন । আমি মাঝে মাঝে মজা করে বলতাম এরকম করলে জমিদারি লাটে উঠবে । তবে না করারও উপায় নেই । না বললেই হয় ঠোঁট ফুলোবে, নয়তো ...

নয়তো মহাজনের কাছে নিজের গয়নাগাটি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করে দেবে । সে তো প্রেস্টিজ নিয়ে টানাটানি । কাজেই যা বলত, তাই করতাম ।

তারপর ?

তারপর সংসারও ভরে গেল । আরো দুই মেয়ে আর দুই ছেলে হল । জমজমাট ব্যাপার । সত্যি বলতে কি , শিলাইদহে আমরা আমাদের দাম্পত্য জীবনের সেরা সময়টুকু কাটিয়েছি ।

আপনাদের ঝগড়া হত ?

হবে না ! ছোটবউ ঝগড়া করত আমি খেতাম খুব কম বলে । আর আমি রেগে যেতাম ও একটুও সাজত না বলে ।

একটুও সাজতেন না ?

না । একদম না । আরে তুমি জমিদার গিন্নি । সারাদিন ভুতের মত পরিশ্রম করো আর পেত্নীর মত সেজে থাক । লোকে কি বলবে ?

তা উনি কি বলতেন ?

কি আবার ? মুখ টিপে হাসত । আর পরক্ষণেই বলত - এই শুনছ ! ঐ পাশের গ্রামের বদরী এসেছিল । ওর নামে সমন এসেছে । তুমি একটু কোতোয়ালিতে বলে দাও না !

তারপর ?

তারপর ! এত সুখ আর সইল না । আমার মাথায় শান্তিনিকেতনের ভূত চাপল আর কষ্টেরও শুরু হল ।

কেন ? উনি কি মানিয়ে নিতে পারছিলেন না ?

না । না । ঠিক উল্টো । সেখানে গিয়েও ত একই দশা । সেই সবারই মা । তবে কষ্ট পেত নিজের ছেলেমেয়েগুলোকেও যখন অন্যদের সঙ্গে বসে জোলো ডাল আর কাঁকড়ে ভরা ভাত খেতে হত । আর বোলপুরে ত খুব গরম ! শিলাইদহের সঙ্গে বোলপুরের তুলনাই চলে না । কেন যে তখন মাথায় শান্তিনিকেতনের ভূত মাথায় চাপল ? খুব কষ্ট গেছে । শারীরিক, মানসিক আর আর্থিক ।

কেন, আর্থিক কেন ?

জমিদারির টাকায় .......

না, বউমা । শান্তিনিকেতন আমার শখ, আমার স্বপ্ন । আমি কেন বংশের জমিদারির টাকা নেব ? ফলে খুব টানাটানির মধ্যে সংসার চলত । কি বলব, কি লজ্জার কথা ! শেষে ছোটবউয়ের গয়নাগাটি বন্ধক রাখতে পর্যন্ত হল ! কবি চুপ করে রইলেন ।

হেমলতাও চুপ করে রইলেন ।

কবি আবার বলতে শুরু করলেন । এত অভাব, তবু আনন্দ ছিল জানো ? কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছা অন্যরকম । মাত্র দেড় বছরই ওখানে কাটাতে পারল । তারপর তো ......

কি হয়েছিল ?

কি জানি । তখন তো কিছু বুঝতেই পারি নি । এখন ডাক্তারেরা শুনে বলে অ্যাপেনডিসাইটিসের প্রবলেম হয়েছিল । সাইলেন্ট বার্স্ট করেছিল । হতেও পারে । প্রথম প্রথম তো বলত - তলপেটে বড্ড ব্যথা । শেষে আর কিছু বলতে পারত না । নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল, কথা বন্ধ হয়ে গেল । কেবলই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকত । আর দুচোখ দিয়ে খালি জলের ধারা গড়িয়ে পড়ত ।

দাদামশাই । আমি কোথায় যেন শুনেছিলাম শেষশয্যায় আপনি নাকি টানা একমাস ওনার সেবা করেছিলেন ?

হ্যাঁ । নার্স আয়া সবই ছিল । কিন্তু আমার ওকে সেবা করতে খুব ভাল লাগত । আমি ওর পাশে থাকলে একটু যেন শান্তি পেত । বুঝতে পারছিলাম যে ও চলে যাবে । তাই যতটা পারি ওকে ছুঁয়ে বসে থাকতাম । তারপর একদিন ......। চুপ করে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ।

আবার অনেকক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইলেন । তারপর হেমলতাই নীরবতা ভাঙলেন । দাদামশাই, আরেকটা কথা জিগ্যেস করবো । রাগ করবেন না তো ?

না না । রাগ করবো কেন ? তুমি বলো ।

দাদামশাই, আপনি আবার বিয়ে করলেন না কেন ? আপনার এত সুন্দর চেহারা, তখন অত অল্প বয়স ! ঘরে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে !

কবি সোজা হয়ে বসলেন ।

হয়ত উচিত ছিল, জানো ? অনেক সম্বন্ধও এসেছিল । আমার দাদা বৌদিরা অনেক চেষ্টা করেছিল । কিন্তু আমি রাজি হই নি । কোথায় আর আমি এমনটি পেতাম বলোতো ? কে এমন করে আমার জীবনটা ভরিয়ে রাখত ? কে আর আমায় এমন করে - 'এই শুনছ' - বোলতো ? তাই আর .......

হেমলতা চুপ করে রইলেন । চোখদুটো তার জলে ভরে এল ।

Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির

শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )