কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস


আজ কাশী বিশ্বনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা দিবস। ১৭৭৭ সালের ২৫শে আগষ্ট, সোমবার, জন্মাষ্টমী তিথিতে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করে দেন ইন্দোরের মহারানি অহল্যাবাঈ হোলকর। কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ভারতের বারাণসীতে অবস্থিত। 

বেদব্যাস বলেছেন -- 
"বারানস্যাঃ পরং স্থানং ন ভূতং ন ভবিষ্যতি।
যথা নারায়নাদ্দেবো মহাদেবাদিবেশ্বরঃ।।"
 -- কূর্ম্ম পুরানম্।।
অর্থাৎ-- যেমন নারায়ন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দেবতা নাই, মহাদেব অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ঈশ্বর আর কেউ নাই, সেইরূপ বারানসী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ স্থান আর নাই।

প্রলয়কালে ব্রহ্মার দিনবসানে যখন সারা জগৎ বিলীন হয়ে যায় তখনও শিব ত্রিশূলের ডগায় কাশীকে ধারণ করেন এবং পরে তাকে স্বমহিমায় স্থাপন করেন। পঞ্চক্রোশ ব্যাপী কাশী হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থ ও মুক্তিক্ষেত্র। এই স্থান মানবের কর্মবন্ধন কর্ষণ বা নাশ করে -- তাই এই স্থানের নাম কাশী।

এই কাশীর প্রতিটা ধূলিকণা শিবসম পবিত্র। স্বয়ং শিব এখানকার মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে বলেছেন -- এখানে আমার লিঙ্গরূপ পূজা করলে, স্মরণ ও মনন করলে আমি সকল ভক্তের প্রতি অতি প্রসন্ন হই ও তাঁদের জীবনের দুঃখ ও বিপদের হাত থেকে রক্ষা করি।

হিন্দু মহাকাব্য মহাভারত-এর পাণ্ডব ভ্রাতারা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ভ্রাতৃহত্যা ও ব্রহ্মহত্যাজনিত পাপ থেকে উদ্ধার পেতে শিবের খোঁজ করতে করতে এই স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন।

মন্দিরের প্রধান দেবতা শিব "বিশ্বনাথ" বা "বিশ্বেশ্বর" নামে পূজিত হন। বারাণসী শহরের অপর নাম "কাশী" এই কারণে মন্দিরটি "কাশী বিশ্বনাথ মন্দির" নামে পরিচিত। মন্দিরের ১৫.৫ মিটার উঁচু চূড়াটি সোনায় মোড়া। মন্দিরটি গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। 

অতীতে বহুবার এই মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ও পুনর্নির্মিত হয়েছে। স্কন্দ পুরাণের কাশীখণ্ডে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। একাদশ শতাব্দীতে হরি চন্দ্র মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। ১১৯৪ সালে মহম্মদ ঘোরি বারাণসীর অন্যান্য মন্দিরগুলির সঙ্গে এই মন্দিরটিও ধ্বংস করে দেন। এরপরেই আবার মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়। এরপর কুতুবুদ্দিন আইবক মন্দিরটি ধ্বংস করেন। আইবকের মৃত্যুর পর মন্দিরটি আবার নির্মিত হয়। ১৩৫১ সালে ফিরোজ শাহ তুঘলক মন্দিরটি আবার ধ্বংস করেন। ১৫৮৫ সালে আকবরের রাজস্বমন্ত্রী টোডরমল আবার মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। এরপর ১৬৬৯ সালে আওরঙ্গজেব পুনরায় মন্দিরটি ধ্বংস করেন। 

প্রাচীন মন্দির ধবংস হয়ে যাবার পর ১৭৭৭ সালে বর্তমান মন্দিরটি পুননির্মাণ করে দেন ইন্দোরের মহারানি অহল্যাবাঈ হোলকর। ১৮৩৫ সালে পাঞ্জাবের শিখ সম্রাট রঞ্জিত সিংহ মন্দিরের চূড়াটি প্রায় সাড়ে আটশো কেজি ওজনের সোনার পাতে মুড়ে দেন।

মন্দির চত্বরটি অনেকগুলি ছোটো ছোটো মন্দির নিয়ে গঠিত। এই মন্দিরগুলি গঙ্গার তীরে "বিশ্বনাথ গলি" নামে একটি গলিতে অবস্থিত। প্রধান মন্দিরের মধ্যে একটি ৬০ সেন্টিমিটার উঁচু ও ৯০ সেন্টিমিটার পরিধির শিবলিঙ্গ রুপোর বেদির উপর স্থাপিত। ছোটো মন্দিরগুলির নাম কালভৈরব, দণ্ডপাণি, অবিমুক্তেশ্বর, বিষ্ণু, বিনায়ক, শনীশ্বর, বিরূপাক্ষ ও বিরূপাক্ষ গৌরী মন্দির। মন্দিরের মধ্যে জ্ঞানবাপী নামে একটি ছোটো কুয়ো আছে। কথিত আছে, শত্রুদের আক্রমণের সময় প্রধান পুরোহিত স্বয়ং জ্যোতির্লিঙ্গটি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে সেটি নিয়ে এই কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, কাশী বিশ্বনাথ মন্দির শিবের পবিত্রতম দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের অন্যতম। আদি শঙ্করাচার্য, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, গোস্বামী তুলসীদাস, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, গুরু নানক প্রমুখ ধর্মনেতারা এই মন্দির দর্শনে এসেছিলেন। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, গঙ্গায় একটি ডুব দিয়ে এই মন্দির দর্শন করলে মোক্ষ লাভ করা সম্ভব।

ॐ নমোঃ শিবায়

Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির

শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )