সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস ( ৩০ শে জুন)
৩০ শে জুন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিবস যা ঐতিহাসিক সাঁওতাল হুল দিবস বা সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস নামে পরিচিত।
আজ ঐতিহাসিক হুল দিবস।১৮৫৫ সালে ৩০ শে জুন ভাগনাডিহির মাঠে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয়। ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রথম এই গণসংগ্রাম পরবর্তী কালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন কে অনুপ্রাণিত করেছে। স্যালুট ও শ্রদ্ধা জানাই সেদিনের সেই বিদ্রোহের বীর সেনানী সিধু-কানু-চাঁদ-ভৈরব-ফুলমনি-ঝানো-ডোমন মাঝি-কালো প্রামাণিক সহ অন্যান্য সৈনিকদের।
মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণ-নিপীড়ন এবং ব্রিটিশ পুলিশ - দারোগাদের অত্যাচারে নিষ্পেষিত সাঁওতাল জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে ১৮৫৫ সালে সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মু এবং দুই ভাই চান্দ ও ভাইরো ভারতের নিজের গ্রাম ভগনাডিহি তে এক বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন। সাঁওতাল জনগণের মহাজনের ঋনের পড়তে হতো বংশ পরম্পরায় তার থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য।সঙ্গে সরকারের খড়্গ নেমে আসতো তাদের ওপর। ১৮৫৫ সালেই যে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা তা নয় ,এর ৭৫ বছর আগে ১৭৮০ সালে সাঁওতাল জননেতা তিলকা মুর্মু ( যিনি তিলকা মাঝি নামে পরিচিত ) নেতৃত্বে শোষকদের বিরুদ্ধে সাঁওতাল গণসংগ্রামের সূচনা হয়। তিনি সর্বপ্রথম সাঁওতাল মুক্তি বাহিনী গঠনের মাধ্যমে পাঁচ বছর ধরে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালান ।১৭৮৪ সালের ১৭ জানুয়ারি তাঁর তীরের আঘাতেই ভাগলপুরের ক্লিভল্যান্ড প্রাণ হারান।১৭৮৫ সালে তিলকা মাঝি ধরা পড়েন এবং তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ১৮১১ সালে বিভিন্ন সাঁওতাল নেতার নেতৃত্বে দ্বিতীয়বার গণ - আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। এরপর ১৮২০ সালে তৃতীয় বার এবং ১৮৩১ সালে চতুর্থবার সাঁওতাল গণসংগ্রাম গড়ে ওঠে।
মহাজন কেনারাম ভগত ও জঙ্গিপুরের দারোগা মহেশাল দত্ত ছয়-সাতজন সাঁওতাল নেতাকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করেন ।সিধু ও কানুকে গ্রেপ্তার করতে উদ্যত হলে বিক্ষুব্ধ সাঁওতাল বিপ্লবীরা ৭ জুলাই পাঁচকাঠিয়া নামক স্থানে মহাজন কেনারাম ভগত,মহেশাল দত্ত সহ তাঁদের দলের ১৯ জনকে হত্যা করে এবং সেখানেই সাঁওতাল বিদ্রোহের আগুন প্রজ্বলিত হয় । এরপর টানা আট মাস ধরে চলে সাঁওতাল বিদ্রোহ। ২১ জুলাই কাতনা গ্রামে ইংরেজ বাহিনী বিপ্লবীদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে। জুলাই মাসেই বীরভূমের বিখ্যাত ব্যবসা কেন্দ্র নাগপুর বাজার ধ্বংস করে বিপ্লবীরা, সেখানে সাঁওতাল জনগণ কে ন্যায্য মূল্যে মাল দেওয়ার পরিবর্তে অত্যাচার করা হতো।
অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সিধু কানুর বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার ' অস্বা সামরিক আইন ' ( অস্ত্র শস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ) জারি করে। ইংরেজ সরকার সামরিক আইন জারি করলেও বিপ্লবের মুখে পড়ে ১৮৫৬ সালের ৩ জানুয়ারি সামরিক আইন প্রত্যাহার করে নেয়।আট মাস বিদ্রোহের পর লেফটেন্যান্ট ফেগানের পরিচালিত ভাগলপুরে হিল রেঞ্জার্স বাহিনীর হাতে সাঁওতালদের পরাজয় ঘটে। সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্বে যে শুধু সিধু - কানু বা চান্দ - ভাইয়েরা ছিলেন তাই নয় , তাদের সঙ্গে সাঁওতাল নারীদের ভূমিকার মধ্যে নাম উল্লেখ করতে হয় দুই বোন ফুলো মুর্মু ও ঝানো মুর্মু। ব্রিটিশ সেপাইরা ফুলো মুর্মু কে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করে তাঁর লাশ রেললাইনে ফেলে রেখে যায়। ইতিহাসের প্রথম বীরাঙ্গনা হিসেবে সাঁওতাল জাতিসত্তা তাঁকে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে । অবশেষে ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ইংরেজদের সঙ্গে লড়াইয়ে সিধু নিহত হন এবং দ্বিতীয় সপ্তাহে কানুকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
সাঁওতাল হুলে সাঁওতালরা পরাজিত হলেও শোষকের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি ।তারই ধারাবাহিকতায় তেভাগা আন্দোলন ও আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে সাঁওতালদের অবদান অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতা - উত্তর বাংলাদেশে এই লড়াকু জাতি আজও নিপীড়িত এবং শোষণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। এরপরও সাঁওতাল হুলের সাঁওতাল জাতিসত্তা সিধু - কানুদের বুক ভরা শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে।
--০০--
কলমে - স্বপ্না ব্যানার্জী
শ্রীরামপুর
হুগলি।
Comments
Post a Comment