হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের মাহেশের রথযাত্রার ইতি কথা
।।শ্রীরামপুর, মাহেশের, রথযাত্রার এবং শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের ঐতিহাসিক কাহিনী সংক্ষিপ্ত বিবরণী।।
-----------------------------------
হুগলি জেলার শ্রীরামপুর শহরের অন্তর্গত মাহেশের রথযাত্রা জগৎবিখ্যাত।
পুরী ধামের পরেই মাহেশের রথের সুনাম। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা উৎসব এই মাহেশের রথ। বহু অবতার , শ্রীরামকৃষ্ণ দেব, শ্রীচৈতন্য
প্রমুখের পদধুলিতে ধন্য শ্রী পাঠ মাহেশ। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র রচিত, রাধারানী, উপন্যাসে মাহেশের রথযাত্রার ঘটনা বহু সাক্ষী রেখে মানুষকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে দিয়েছে।
সাধক ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ মন্দির প্রথম অবস্থিত ছিল মাহেশের বর্তমান জগন্নাথ ঘাটের পাশে। প্রায়ই ২৫৩ বছর আগের কথা। সেই সময়ে ভাগীরথীর পশ্চিম কুল অক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে। সেই সময় কলকাতার পাথুরিয়া ঘাটের নিবাসী দানবীর নয়নচাঁদ মল্লিক মহাশয় বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন।
জগন্নাথ দেবের ভোগ রন্ধন হয় কাঠে। রন্ধন হয় সন্ধক লবণ ও ঘৃত ব্যবহৃত হয়।
আতপ চাল বা গোবিন্দভোগ চালের পরমান্ন ও অড়হর ডাল রন্ধন হয়। বিশেষ দিনে পোলাও ভোগ ছানার ডালনা, ধোকা ,মালপোয়া, মিষ্টান্ন নিবেদন হয়। আর আছে লুচি ভোগ যা সন্ধ্যা আরতিতে ভোগ নিবেদন হয়।
জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার স্নানযাত্রার তিথিতে তিন বিগ্রহ কে স্নান মঞ্চে নিয়ে এসে স্নান করানো হয়। এই সময়ে রিষড়া নিবাসী কুমোর পরিবারের আনা সুগন্ধি কর্পূর দেয়া কলাপাতায় মোড়া মাটির কলসির গঙ্গাজল ও দেড় মন দুধ দিয়ে তিন বিগ্রহকে স্নান করানো হয়।
স্নানযাত্রার একদিনের পর মন্দিরের মূল যাত্রাপথ বন্ধ হয়। এই সময়ে বিগ্রহ ত্রয়ের অঙ্গরাগ সাধন করা হয়।
এতে কোন রাসায়নিক রং ব্যবহার করা হয় না। কাজল লতা বা কালো ভুষি থেকে কালো রং, সাদা শঙ্খ বা সাদা খড়ি থেকে সাদা রং, পুনস থেকে লাল রং হয়।
এই সময়ে বিগ্রহের গায়ে উত্তাপ অনুভব করা যায়।
এরপর শুভ অমাবস্যা তিথিতে মন্দিরের দরজা খোলা হয়। উক্ত দিবসে প্রভুকে ,অলংকার দিয়ে মালা দিয়ে সাজানো হয়। এই সময়ে মিষ্টান্ন নিবেদন করেন, ভক্তরা। হোম যজ্ঞের মাধ্যমে বিগ্রহ ত্রয়ের অভিষেক, প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও চক্ষুদান হয়।
মাহেশের এই উৎসবকে বলা হয় নবযৌবন উৎসব।
রথযাত্রা এই বিষয়ে একটি কথা প্রচলিত আছে।
মে মাস ১৭৫৭ সালে কৃষ্ণরাম এক বিশাল পঞ্চচুড়া বিশিষ্ট কাঠের রথ তৈরি করে দেন।
কিন্তু ওই রথটিতে এক গ্রামবাসী আত্মহত্যা করেছিলেন বলে এই রথটি বাতিল হয়।
এরপর ১৮৬৫ সালে রাম বাহাদুর কালাচাঁদের দ্বারা একটি রথ নির্মিত হয়। ১৮ ৮৪ সালে জগন্নাথ মন্দিরের সেবাইতদের সঙ্গে বল্লভপুর সেবাইতদের দাঙ্গা হয়।
রথটি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয় । ঐ বছরটিকে কালো বছর বলে। এরপর পরম ভক্ত মহান দাতা দানবীর দেওয়ান কৃষ্ণচন্দ্র বসু বহু অর্থ ব্যয় করে বর্তমান রথটি তৈরি করেন। এই রথটি তৈরি করতে কুড়ি লক্ষ টাকা খরচ পড়ে।
রথটির উচ্চতা, ৫০ ফুট, ওজন ১২৫ টন, চার তলা বিশিষ্ট আটটি ছোট ও একটি প্রধান নিয়ে মোট নটি চূড়া।১২ টি চাকা ও, ৯৬ জোড়া চোখ আঁকা আছে। এই রথটির প্রথম তলায় শ্রী চৈতন্য লীলা, দ্বিতীয় তলায় শ্রীকৃষ্ণলীলা,
তৃতীয় তলায় শ্রী রামলীলা,
এবং চতুর্থ তলায় শ্রী জগন্নাথ দেবের সিংহাসন অবস্থিত।
এই রথের দড়ি দুটির পরিধি ১০ ইঞ্চি, দৈর্ঘ্য ১০০ গজ, ব্রেক হিসেবে ৫০ ফুট কাঠের লম্বা বীম আছে। রথ চালাবার জন্য কাসর ঘন্টা বাজানো হয় ও থামাবার জন্য বন্দুক , ছোঁড়া হয় । রথের অশ্বদুটি সম্পূর্ণ তামার, একটি নীল ও একটি সাদা, তৈরি করেন জয় ইঞ্জিনিয়ারিং, ইংল্যান্ড। সারথি কাঠের। রাজহংশ দুটি প্রমাণ সাইজের কাঠের।
এরপর শুক্লা দ্বিতীয় তিথিতে রথযাত্রা শুরু হয়। রথের টান শুরু হয় বিকাল ৪ ঘটিকায়। জগন্নাথ , বলরাম ,ভদ্রাসহ রথে চড়ে মাসির বাড়ি গমন করেন। মাহেশ থেকে মাসির বাড়ির দূরত্ব এক কিলোমিটার হবে।
আবার আট দিন পর নিজ মন্দিরে আগমন করেন।
সবশেষে এটা বলতে চাই - শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ দেব, এই দুই অবতারের পদধুলিতে মাহেশ ধন্য ও মহাতীর্থে পরিণত হয়েছে।
----------------------------------
Comments
Post a Comment