" নিজেকে ভালোবেসো "


" নিজেকে ভালোবেসো "


আমার বৌভাতের বেনারসীটা সেরকম ঠিকঠাক হয়নি। ওনার হাতে টাকা কম ছিল সেই সময়ে।  তখন রিসেপশন বলার চল ছিল না।বিয়ে আর বৌভাত এই দুটোই মূল অনুষ্ঠান ছিল। 

ঘন নীল। সাথে রানী রঙের পাড় আর আঁচল। শাটিন বেনারসী নিলে ওই টাকায় ভালোই জমকালো পাওয়া যেত। কিন্তু কাতান কিনেছিলাম বলে ভিতরে অল্প বুটি। সাধারণ কাজের পাড় আর আঁচল। তবে রঙটা অসাধারণ ছিল। কলেজ স্ট্রিটের ইন্ডিয়ান সিল্ক হাউস থেকে কেনা। 

ভেবেছিলাম পরে একটা ঠিক এই কম্বিনেশনেরই খুব কারুকাজ করা দামী বেনারসী কিনব। 

 কেনা হয়নি।
বিয়ের এতগুলো বছর পার হয়ে গেল। আজ মনে হয় সেই প্রস্তর যুগে বিয়ে বৌভাত হয়েছিল ! 

প্রথম দিকের বছরগুলোতে খুব ভাবতাম এই বছর কিনবই। তারপর আস্তে আস্তে ভুলে গেলাম! নিজেকেই ভুলে ছিলাম সম্ভবত! 

কাল রাতে হঠাৎ মনে পড়ল....! অনেকগুলো তসর বেনারসীর ছবি পাঠিয়েছেন এক উইভার।
সেগুলো ডাউনলোড করতে করতে.....

আমরা মেয়েরা খুব সহজেই নিজের আত্মবিসর্জন দিয়ে ফেলি। সমাজ সেটাই শেখায় ছোটবেলা থেকে।
মা কাকিমাদের আড্ডাতে শুনতাম অমুকদি খুব ভালো.. কারণ এম এ (সেই সময়ের) পাশ হয়েও চারবেলা রান্না করছে! ছেলেমেয়েদের মানুষ করছে!
অমুক মাসী খুব ভালো কারণ ফুলশয্যার রাতেই যে বর বিবাগী হয়ে চলে গেল...সারা জীবন তার জন্যই অপেক্ষা করে গেল!
এভাবেই...
টুকরো টুকরো কথা... ঘটনা আমাদের মধ্যে গেঁথে যায়! গেঁথে দেওয়া হয় সুনিপুণ ভাবে। 

আজ আমাদের নিজস্ব বাসস্থান হয়েছে। গাড়ি হয়েছে। অর্ধেক ভারতবর্ষ ঘুরে ফেলেছি। 

কিন্তু....
সেই বেনারসীটা আজও কেনা হয়নি! আর হবেও না। কারণ এখন আমার নিজেরই মনে হয় ধুর... ওটা বাজে খরচ! 

তাই সবাইকে বলছি...নিজের শখ...নিজের ইচ্ছেগুলোকে প্রাধান্য দিও। যে সময় চলে যায়...সেই সময়টা আর ফিরে আসেনা। 
একটাই জীবন! 

আমরা বড় বেশি ভাবি অন্যদের কথা... অন্যদের ভালো রেখে সুখ... খাইয়ে সুখ...সাজিয়ে সুখ... আত্মত্যাগের মহান মন্ত্রে সাজাই 'সোনার সংসার'... ! 
আর... 
তারপর সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার বিফল চেষ্টায় তার জীবনে অযথা নাক গলানো! 
ছেলের বৌয়ের কাছে কিংবা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিজেকে অপ্রিয় করে তোলা! 

শেষ বেলায় একেবারে একলা হয়ে কুঁচকে যাওয়া চামড়া নিয়ে ঝাপসা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজতে থাকি এক আনমনা কিশোরী কন্যেকে যে অন্য সবার স্বপ্ন সফল করতে গিয়ে নিজেকে ভুলে গিয়েছিল...স্যাক্রিফাইসিঙের মহান বর্মের আড়ালে ক্ষয়ে গিয়েছিল তার নিজের সত্ত্বা! 

এমনটা যেন না হয়। 
নিজের কথা ভাবো। নিজেকে ভালবাসো। 
বাড়ির সবাইকে যখন ফল কেটে গুছিয়ে দাও তেমনি নিজের জন্যও একটা প্লেট গোছাও। 
গরমের বিকেলে গা ধুয়ে চুল আঁচড়ে এক গ্লাস আম পান্না নিয়ে ছাদে যাও। 

পৃথিবীতে কোনো কিছু কারোর জন্য আটকে থাকেনা। 
সুতরাং প্রতি মুহূর্তে 'ওরা কি খাবে' এটা না ভেবে একটা বেলা অন্তত নিজের জন্য রাখো। বন্ধুদের সাথে সিনেমায় যাও। আলমারি থেকে শাড়ি নামিয়ে নিজেকে সাজাও। মেলা থেকে কেনা নতুন দুলটা পরো।  নিজেকে প্রাণ ভরে দেখো আয়নাতে। 

একটাই জীবন! আফশোসের ধ্বংসস্তুপে তলিয়ে যাওয়ার আগে পরম মমতায় নিজের হাতটা নিজেই ধরো।

Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির

শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )