তিন বিপ্লবীর ফাঁসি


তিন বিপ্লবীর ফাঁসি

তিনজনের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল ২৪শে মার্চ ভোরবেলায়, কিন্তু দেশজুড়ে বিক্ষোভের আঁচ দেখে ভয় পেয়ে গেল প্রশাসন। তাই লাহোর জেলে এসে গেল নির্দেশ, নির্ধারিত সময়ের এগারো ঘন্টা আগেই তিন বিপজ্জনক বন্দীর ফাঁসি কার্যকর করা হবে। সেই মতো নেয়া হলো চূড়ান্ত প্রস্তুতি।

২৩শে মার্চ, ১৯৩১। বিশেষ আদেশে মৃত্যুপথযাত্রী বন্দীকে দেয়া হয়েছে সেদিনের খবরের কাগজ। নির্জন সেলে বসে তাই ‘The Tribune’ পত্রিকা পড়ছিলেন ভগৎ সিং। সেদিনকার কাগজে লেনিনের লেখা একটি বইয়ের রিভিউ বেরিয়েছিল, সেটাই মন দিয়ে পড়ছিলেন তিনি। কখন যে গরাদের ফাঁক দিয়ে রবিকিরণ আসা বন্ধ হয়ে গেছে, খেয়ালই করেননি। হুঁশ ফিরল চীফ ওয়ার্ডার চতুর সিংয়ের ডাকে।

নামে চতুর হলেও ধর্মপ্রাণ এই শিখ মানুষটি সম্ভ্রমের চোখে দেখতো ভগত ও জেলবন্দী তাঁর দুই সহযোগীকে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এমন নির্বিকার থাকতে পারে যারা তাঁরা আর যাইহোক সাধারণ মানুষের পর্যায়ে পড়ে না। ভগতের সেলের বাইরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘বেটা অব তো আখরি ওয়াক্ত আ পঁহুছা হ্যায়। মেরা এক বাত মান লো.....!"

ভগৎ হেসে বললেন,’বেশ তো বলুন কি হুকুম?’ চতুর সিং আন্তরিকতার সাথে বললেন, ইস আখরি ওয়াক্ত পর ‘বাহেগুরু’ কা নাম লে লো, আউর গুরুবানী কা পাঠ করলো বেটা।
শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন ভগত । তারপর বললেন “কিছুদিন আগেও যদি আপনি এই হুকুম করতেন তাহলে আপনার ইচ্ছা ও হুকুম দুটোই আমি পূরন করতাম। এখন অন্তিম সময়ে যদি ওয়াগুরু কে স্মরণ করি তাহলে নির্ঘাত তিনি বলবেন, এ বেটা একদম ডরপোক ! সারা জীবন আমাকে স্মরন করলোনা ,এখন ফাঁসির দড়ি দেখে ভয় পেয়ে আমাকে ডাকছে। এর চাইতে ভালো যেভাবে আমি সারাটা জীবন কাটিয়েছি সেইভাবে দুনিয়া থেকে চলে যাই। লোকজন আমাকে নাস্তিক বলে ঠিকই কিন্তু ডরপোক আর বেইমান তো কেউ বলতে পারবেনা !

চতুর সিং এর ইচ্ছা বা হুকুম কোনটাই কাজে এলোনা, ম্লান মুখে বিদায় নিলো সে। ভগত আবার কাগজ পড়ায় মন দিলেন। খানিকক্ষণ পরে ঝনঝন করে খুলে গেল তাঁর সেলের তালা। জেলার দলবল সহ ভেতরে এসে বললেন, সর্দারজী ফাঁসি লাগানে কা হুকুম আ গ্যয়া হ্যায়। আপ তৈয়ার হো যাইয়ে।‘ কাগজ থেকে মুখ তুলে বললেন ভগৎ, থোড়া সা সময় আউর সির্ফ আর দো লাইন রহে গিয়া।

মিনিট খানেক পরেই কাগজ রেখে তেজদীপ্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন ভগৎ। অব তো চলনা চাহিয়ে। সান্ত্রীরা হাতকড়া পড়াতে যেতেই তীব্র আপত্তি জানালেন। আমরা কি খুনী আসামী যে হাতকড়া পড়াচ্ছেন ? শেষমেশ বয়স্ক ওয়ার্ডার চতুর সিংয়ের অনুরোধে পড়ে নিয়ে বেরিয়ে এলেন সেল থেকে। ইতিমধ্যে অন্য সেল থেকে এসে গেছেন সুখদেব আর রাজগুরু। পরম আনন্দে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলেন তাঁরা।

ফাঁসির মঞ্চে ওঠার পর আবার বিপত্তি, কালো পোশাক কেউ পরবেন না তাঁরা। তোমাদের রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বন্দী আমরা, রাজনৈতিক বন্দী। কোন চোর ডাকাত নই । আমরা কেন ঐ পোষাক পরবো ? বেচারা জেলার পাকে পড়ে কাতর অনুরোধ জানিয়ে বললেন, ‘এটা নেহাতই একটা জেলের প্রথা। এত মুল্য দেবেননা আপনারা’। শেষে রাজী হলেন ওরা। এরপর উচ্চস্বরে স্লোগান তুললেন তাঁরা......... ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ মুর্দাবাদ’।

তাঁদের সঙ্গে গলা মেলালেন লাহোর জেলের সমস্ত বন্দীরা। সমবেত কন্ঠের আওয়াজে গমগম করে উঠলো গোটা জেল চত্বর। ভগত মৃদু হেসে জেল কর্তাদের  উদ্দেশ্য করে বললেন , 'আপনারা সত্যিই বড় ভাগ্যবান। ভারতীয় বিপ্লবীরা তাঁদের আদর্শের জন্য কিভাবে প্রসন্ন চিত্তে হাসতে হাসতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে, তা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন।'

"জিন্দেগী তো অপনে দম পর হি জিয়ে যাতি হ্যায়,
দুসরো কে কানধে পর তো সির্ফ জানাজে উঠায়ে যাতে হ্যায় !"
বেঁচে থাকলে আজকে বয়স হতো ১১৫ বছর, কিন্ত মাত্র তেইশ বছর বয়সেই স্বাধীনতার লক্ষে অলবিদা জানালেন দুনিয়াকে ।

সংগৃহীত

Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির

শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )