15 August 2022



নামে 
নিশি রাতে অপ্সরার জলকেলি। 
কলমে অশ্রুকণা দাস।
ফাগুন পূর্ণিমার চাঁদ উজাড় করে ভাসিয়ে দিয়েছে জোছনাকে।পাহাড়ের বুকে জ্যোৎস্না যেন আপন মাধুর্যে অকাতরে সাজিয়ে তুলেছে রাতের এ নির্জন প্রকৃতি কে।পূর্ণিমা নিশি রাতের চাঁদের শোভা  পাহাড়-জঙ্গল ঝরনার সৌন্দর্য  দেখার ইচ্ছা সকল প্রকৃতিপ্রেমিক'কে আকর্ষণ করে। চাকরি নিয়ে শিলংয়ের উম্রই বিমানবন্দরে প্রথম পোস্টিং অনিরুদ্ধের।গ্রামের ছেলে শান্ত ও লাজুক প্রকৃতির কিন্তু খুব সাহসী। 

চাঁদনী রাতের দৃশ্য দেখার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করলে কলিগরা বলে রাত্রে বাইরে বেরোনো বিপদজনক। তারা বলছে পূর্ণিমা রাতে এক ঝাঁক বধুঁয়া খিলখিল করে হাসতে হাসতে পাহাড়ি নদীতে জলকেলি করে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। ভূত অথবা কোন অপ্সরা হবে হয়ত সে কারণ পিছনদিকে অরণ্য সংকুল পাহাড়ে কেউ রাখতে বাইরে বেরোয় না। শীতের জায়গা বাইরে বেরোনোর পরিবেশও নেই। 
অনিরুদ্ধর কৌতূহল আরো বেড়ে গেল পূর্ণিমা রাত্রে সৌন্দর্যের সাথে অপ্সরার বিষয়টা আরো রোমাঞ্চিত করে তুলল।একদিন নিজের মতো নতুন আরও তিনজনকে নিয়ে পরিকল্পনা করলো আগামী পূর্ণিমা রাত্রে চৌকিদারকে লুকিয়ে সাবধানতার সাথে পিছনের ছোট গেট টপকে চারজন বেরিয়ে পড়বে।নির্দিষ্ট দিনে যথাসময়ে বড় টর্চলাইট ও একটা করে লাঠি হাতে নিয়ে শীতের পোশাক টুপি গ্লাভস সব পরে  একে একে তৈরি হয়ে মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।চৌকিদার বাঁশি বাজাতে বাজাতে চারিদিকে রাউন্ড দিচ্ছে এক সময় বাঁশির শব্দ থেমে গেল।দুজন চৌকিদার একজন সাংমা ও অপরজন প্রধান।তারা নেশায় বুঁদ হয়ে টহল দিতে দিতে অদৃশ্য হয়ে গেল উম্রই বিমানবন্দরে তখন একদম নতুন দু এক বছরের শিশুর বলা যেতে পারে। রাতে বিমান উঠানামা করেনা। অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধতা চারজন পরিকল্পনা মতো একে একে সাবধানে ছোট গেট টপকে বাইরে বেরিয়ে গেল।অনিরুদ্ধ বাঙালি দুজন কেরালা ও মহারাষ্ট্রের আর একজন ছেলে বাসর গুপ্তা কেউই আঞ্চলিক ভাষা বোঝে না ।

জোছনা  রাতের অকল্পনীয় সৌন্দর্য আর নীরবতায় গা ছমছম করছে।আস্তে আস্তে পাহাড়ের ঢালে নেমে যাচ্ছে।সহসা কোনো নিশাচর পাখি মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল।মুখে কোনও শব্দ নেই ভয় পেয়ে একে অপরের হাত ধরে পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে। নিঃশ্বাসের শব্দটাও যেন কানে বাজে।এমন সময় অনেক দূর থেকে নারী কন্ঠ ও হাসির শব্দ ভেসে আসছে।আঞ্চলিক ভাষা না বুঝলেও হাসি কান্নার ভাষা সারা বিশ্বে একই রকম সে কারণ হাসির শব্দ বোঝা যাচ্ছে।ধীরে ধীরে শব্দ অনেক কাছে এসে গেছে । পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে ছায়া পড়ছে চাঁদের আলোতে।চারজন পাহাড়ের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে ভয় তে জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে।যদি ওদেরকে দেখে কিছু জিজ্ঞাসা করে।অপ্সরা যাদুমন্ত্রের দ্বারা শেয়াল কুকুর বানিয়ে দেয় যদি অজ্ঞান করে দেয় এরকম নানান 
 চিন্তা প্রত্যেকের মাথায় ঘুরছে। 
এতকিছু ভাবনার মধ্যে সামনে দিয়ে এক ঝাঁক অপ্সরা পাহাড়ের একদম নিচে নেমে গেল। 

এবারের একটু সাহসে ভর করে ওরা নিচের দিকে নেমে দেখে পাহাড়ি নদীর জলে চাঁদের আলোয় ওরা জলকেলি করছে এবং দু-চারজন ভূতের মতন মানবী নদীর পাড়ে পায়চারি করছে অবাক হয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ সব অদৃশ্য হয়ে গেল গভীর নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরল। নিজেরা বিস্ময় হতবাক শরীরের তাপমাত্রা ঠিক আছে তো নাকি ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে দেখে নিচ্ছে।প্রায় ঘণ্টাখানেক হবে কারো মুখে কোন শব্দ ছিল না।নিশাচরেরা যেন ওদেরকে প্রদক্ষিণ করে যাচ্ছে বারবার। রহস‍্য কিছুই বুঝতে পারল না।

এবারে ঘরে ফেরার জন্য বিপরীতমুখী হতেই দেখে দারোয়ান প্রধান দাঁড়িয়ে আছে। সবাই খুব হকচকিয়ে গেছে।প্রথমে তো চিনতেই পারেনি। প্রধান হিন্দিতে যা বলছে আমি তা বাংলায় লিখছি। ভয় পাবেন না স্যার, আমি আপনাদের পরিকল্পনার কথা আগেই বুঝতে পেরেছিলাম কারণ আমি নেপালি আছি তবে আঞ্চলিক ভাষার সাথে বাংলা অসমীয়া এমনকি সিলেটি ভাষা বুঝতে ও বলতে পারি।আপনাদের যাতে কোনো বিপদ না হয় সেজন্য আমি আপনাদের অজান্তেই আপনাদের কাছেই ছিলাম। গেট টাও খুলে রেখেছিলাম কিন্তু লক্ষ্য করেননি আপনারা সবাই টপকে বেরিয়েছেন।দারোয়ানের কাছে ওদের একটু অপরাধবোধ কাজ করছে। তবে নিশ্চিত যে প্রধানকে ধরেই জানতে হবে রহস্যটা কি আছে? সেই রাত্রে সবাই প্রধান কে বলছে তুমি নিশ্চয়ই জানো এরা কারা কোথা থেকে আসে কোথায় যায়? তোমাকে আজ বলতেই হবে।প্রধান বলছে আপনারা ঘরে নেই কেউ জানতে পারলে কাল অফিসে আপনাদের অসুবিধায় পড়তে হতে পারে।আজ যে যার ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন পরে সময় করে সব বলবো একদিন।

দু চার দিন পর প্রধানের কোয়ার্টারে অতি গোপনে চারজন মিলিত হয়েছে। টানটান উত্তেজনা সাংমা জানতে পারলে মুশকিল সে কারণ প্রধান আজ সাংমাকে একটু বেশি নেশা করিয়ে ওর ঘরে ঘুমাতে পাঠিয়ে বাইরে দিয়ে দরজা তালা বন্ধ করে দিয়েছে ।গভীর রাত্রে রহস্য উদ্ঘাটন হবে।প্রধান ঘরে ড্রিংস এর ব্যবস্থা করে রেখেছে দেশের রীতি অনুযায়ী অতিথি আপ্যায়ন করবেন কিন্তু কেউ আগ্রহী নয় সবাই রহস্য ভেদে উদগ্রীব হয়ে আছে।ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।অনিরুদ্ধ একটু ধমকি দিয়ে প্রধান কে বলছে "তোমার কিছু জানা থাকলে তাড়াতাড়ি বল আর তাল বাহানা করো না।"প্রধান  বলছে। 
"শুধু পূর্ণিমার রাত্রি নয় প্রতিরাত্রে দূর দূর বস্তি থেকে মেয়েরা সন্ধ্যাবেলায় শহরে যায়। শহরের বিভিন্ন হোটেল বারে ডান্স করে ও কল গার্লের  কাজ করে। মেন রোডে গাড়ি এসে ওদের ছেড়ে যায়।বিমান বন্দরের দিকে রাত্রে গাড়ি আসেনা।তাছাড়া রাস্তা ও নেই পায়ে হাঁটা রাস্তা।এই রাস্তায় হাসতে হাসতে গল্প করতে করতে হেঁটে ওরা বাড়ি ফেরে। ফেরার পথে শীত বর্ষা বারোমাস ওই নদীর জলে অবগাহন করে দেহমনের  ক্লান্তি দূর করে পরিষ্কার পোশাকে ঘরে ফেরে।ওদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকজন ওদের গ্রাম থেকে আসে শুকনো পোশাক নিয়ে।পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আলোতে জলকেলি করে বিশেষ আনন্দে। পরেরদিন অন্যদল শহরে যায় এই কাজে জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ি বস্তির মেয়েরা এই ভাবে রোজগার করে।বর্তমানে রাস্তাঘাট স্কুল এবং চাষাবাদ কিছু হয়।এয়ারপোর্ট হবার পর অনেক উন্নতি হয়েছে এই অঞ্চলের।বিমানবন্দরের কাজ শুরু হলো শেষ হলো এবং বিমান ওঠানামা চালু হলো তখন কোন চৌকিদার সকলের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করার জন্য গল্প বানিয়েছিল ভূত বা অপ্সরার।এই গল্পটা।যাতে বিমানবন্দরের কোন কর্মী বা অফিসার কোনভাবে এদের প্রতি আসক্ত না হয় এবং  নিজের কাজ ও কিছুটা হালকা হয়।নিশ্চিন্ত হয়ে ঠান্ডার রাতে ঘরে ঘুমাতে পারে কারণ পাহাড়ি অঞ্চলে পূর্ণিমার সৌন্দর্য দেখার শখ অনেকেরই থাকে সেটা বন্ধ করার জন্য ভূতুড়ে গল্প বানিয়ে ছিল এই বৃদ্ধ সাংমা যে প্রথম থেকেই এখানে কাজ করছে। এরই বানানো গল্প। 
অনিরুদ্ধদের এই  রহস্য ও ভয়ের অবসান হলো বটে তবে শ্রদ্ধা ঘেন্না মেশানো একটা অনুভূতিতে জীবনের গল্পে হতবাক হয়েছিল। সদ্য চাকরি প্রাপ্ত যুবক কয়জন। নমস্কার


Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির

শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )