15 August 2022
#আকাশছোঁয়া
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
"মা স্বাধীনতা কি গো ?"- হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকলো ফিঙে। বাসন্তী তখন একচিলতে মেঝেতে বসে হাড়ি খুলে আগের দিন রাতে রাখা জল ঢালা ভাত থেকে চিপে চিপে জল গুলো আলাদা করছে।
ছেলের উত্ত্যেজনামূলক প্রশ্নে একরাশ বিরক্ত নিয়ে তাকালো বাসন্তী। তারপর অবাক হয়ে বললো " কি ?" ফিঙে আবার বললো " স্বাধীনতা গো স্বাধীনতা "বাসন্তী বললো " সে আবার কি ?"ফিঙে প্রায় নাচতে নাচতে বললো " বড় মাঠের ধারে সকাল থেকে কি ভিড়, লম্বা একটা লাঠির মাথায় একটা রঙিন কাপড় উঠিয়ে দিলো। ওঠার সাথে সাথে ঝরে পড়লো ফুল। কি সুন্দর গান বাজছে। মনে হচ্ছে যেন পিকনিক। ওই যে রং খেলার আগের দিন রাতে আমরা যেমন করি ! ঠিক সেরকম।
ছেলের মুখে গল্প শুনতে শুনতে ভাত গুলো সবটাই প্রায় জল থেকে উঠিয়ে নিয়েছে বাসন্তী। ভাতের পরিমানটা হাত দিয়ে মেপে দেখলো ছেলের আর ওর দুজনের হবে না। চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো বাসন্তীর মুখে। প্রতিদিন রাতে হিসেব করে চাল নেয় রাতে খেয়ে সকালেও দুজনের থাকে।
ভাতটা খেলে পেটে থেকে যায় অনেক্ষন।কিন্তু আজ পান্তা যে কম পড়েছে!ছেলের ওর দুজনের হবে না।মুড়ির কৌটো ফাঁকা পরে আছে সেই কবে থেকে। আসলে এখনো দুই বাড়ির মাইনা টা পায়নি ও।
ওদিকে ঘড়ির কাঁটা এগিয়েই যাচ্ছে। এই সময় ও প্রথম বাড়িতে ঢুকে যায় কাজ করতে। আজ ওই বাড়ির বৌদি বলে দিয়েছে একটু বেলায় ঢুকতে। আজ সবার ছুটি তাই বেলা অবধি ঘুমাবে সব। তাও অনেকটাই বেলা হলো। সাড়ে আটটায় বেরিয়ে চারটে বাড়ি সেরে আসতে একটা বেজে যায় এমনি দিনই , আজ নটা বেজে গেছে। ছেলেকে বলে দিলে ভাতে ভাত ঠিক বসিয়ে দেবে স্টোভে। কিন্তু কেরোসিন তেলও প্রায় তলানিতে ঠেকেছে।তেল দেবে আবার পরশুদিন।
এই দুদিন কিভাবে চলবে জানে না বাসন্তী। হঠাৎ প্লাস্টিকের খচখচ আওয়াজে বাসন্তী দেখলো ফিঙে কি একটা খোলার চেষ্টা করছে। বাসন্তী তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতেই ফিঙে বললো "ওখান থেকে দিল। কেক ডিম আর কলা।" বাসন্তীর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো। বললো কারা করছে এসব? ফিঙে বললো নবীন দারা। ও নেতা হতে এসব ভালোভালো কাজ শুরু হলো।
ওদিকে সমীর কাকা যতদিন ছিল খালি এই দাও আর ওই দাও। খুব বাজে ছিল সমীরকাকা।" কথাগুলো বলতে বলতেই ফিঙে কেক টা খুলে এনে মায়ের সামনে ধরে বললো "নাও খাও। "
বাসন্তী ছেলের খাবারটা জোগাড় হয়েছে দেখে একটু নিশ্চিন্তে বললো -"তুই খা বাবা, এসব তো তোর খাওয়াই হয় না।" ফিঙে বললো "সে তো তোমারও হয় না!"বাসন্তী বললো "আমার ভাত টাই ঠিক আছে।চার বাড়ি কাজ করে তবে ফিরবো!ভাত টুকু বরং আমি খেয়ে নি!"
বলেই বাসন্তী বসে একটু সর্ষের তেল আর নুন নিয়ে ভাত গুলো মেখে খেতে শুরু করলো! ফিঙে বললো "ও মা বলতে ভুলে গেছি নবীন দা বললো আজ দুপুরে ওখানেই খাওয়াবে বস্তির সবাইকে।মধু দা বললো মাংস ভাত খাওয়াবে নাকি!" বলার সময় মুখের জল টুকু গিলে নিলো ফিঙে।
বাসন্তীর চোখে মুখেও খুশি। ভাবছিলো কেরোসিন তেল যা আছে একদিন হবে, আজ দিনটা এভাবে চলে গেলে কাল ওই টুকু তেলে হয়ে যাবে।নিজের মনে ভেবে একটু যেন নিশ্চিন্ত হলো বাসন্তী। তিনবেলা দুজনের কি খাওয়া হবে এটার হিসেবে মেলাতে মেলাতে মাথা খারাপ হয়ে যায় ওর।
"স্বাধীনতা দিনটা কি ভালো গো মা ,কত খাবার !" ফিঙে কেকটা মুখের মধ্যে আরেকটু ঢুকিয়ে বললো।ছেলের কথায় উত্তর দিতে গিয়ে বিষম্ খেল বাসন্তী,গোগ্রাসে ভাত গুলো খাচ্ছিল।জগ থেকে একটু জল গলায় ঢেলে বললো "হুম স্বাধীনতা মানেই ভালোভাবে বাঁচা।"
ফিঙে চোখ বন্ধ করে ডিমে কামড় বসালো। চোখেমুখে স্বর্গসুখের আনন্দ।বললো "আচ্ছা সমীর কাকা চলে গেলো বলেই আজ দিনটা পালন করছে ওরা?"বাসন্তী কিছু না বলে খেয়েই
যাচ্ছে।ফিঙে কুসুম টুকু ধীরে ধীরে খাচ্ছে পাছে শেষ হয়ে যায়!খেতে খেতে আবার বললো "মা কেউ চলে গেলে কি কাপড়টা ওড়ানো হয় ?"
বাসন্তী খেতে খেতেই বললো " কোন কাপড়!"ফিঙে বললো ওই যে কাপড়টা যেখানে কমলা সবুজ সাদা রং মাঝে একটা গোল মতো চাকা আছে !"
বাসন্তী হেসে বললো "ধুর বোকা, ওটা কাপড় কেন ওটা তো পতাকা,আমাদের দেশের পতাকা। ভালো কাজে ওটা ওড়াতে হয়। ওটাকে কখনো পায়ে মারাতে নেই। মাটিতে ফেলতে নেই! বুঝলি?"
বলতে বলতে এঁটো বাসনটা নিয়ে বাইরের কল থেকে থেকে ধুয়ে নিয়ে এলো বাসন্তী। জায়গাটা মুছে নিয়ে বললো " আমি বেরোলাম রে , তুই দরজা না আটকে কোথাও যাবি না কিন্তু !" ফিঙে কলাটা খেয়ে ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে বললো " চলো ,আমিও যাই। রান্নাবান্না হচ্ছে ক্লাবের পিছনে দেখি কিরকম হচ্ছে সব !"
******
বাসন্তী আর ফিঙে হাটতে হাটতে যখন বড়মাঠের সামনে এলো তখন তিন রঙা পতাকাটা উর্দ্ধ আকাশে আপন গরিমায় উড়ে চলেছে। ছোট ছোট পতাকা দিয়ে সাজানো রয়েছে পুরো বস্তিটা। ভাঙাচোরা ঘিঞ্জি বস্তি কি সুন্দর লাগছে দেখতে আজ।
সাথে চলছে দেশের কতরকমের গান। বাসন্তী দেখলো সামনে কত ছবি টানিয়েছে। নেতাজি , সূর্যসেন , বিনয় বাদল, দীনেশ আরও কয়েকজন সবাইকে চেনে না বাসন্তী। ক্লাস থ্রিয়ের বিদ্যায় আর কত জানবে !আর অভাব জানার ইচ্ছেটাকে মেরেও ফেলে !নাহলে নার্সারি , কেজি পড়িয়েই ছেলের পড়াশোনা ছাড়িয়ে দেয়!
"ও কাকিমা , ফিঙের নাম নেবো ?"বাসন্তী দেখলো বস্তির একটা ছেলে জিজ্ঞেস করছে ! বাসন্তী বললো " কিসের ?"ছেলেটা বললো "নবীন দা বলেছে ক্লাব ঘরে রোজ সকালে ইস্কুল শুরু হবে "
শুনেই লাফিয়ে উঠলো ফিঙে।ওর খুব ইচ্ছে করে ওর স্কুলে যেতে ,সেই যে বাবা মারা যাওয়ার পর সব থেমে গেলো!
বাসন্তী একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ছবিগুলোর দিকে।নিজের অজান্তেই কপালে হাত ঠেকালো। ফিঙে বললো- "মা ওনারা ঠাকুর নাকি ?"বাসন্তী বললো " ঠাকুরই তো ! ওনাদের আশীর্বাদেই তো আজ এতো ভালো হলো !"বলেই বাসন্তী এগিয়ে গেলো নিজের কাজে।
ফিঙেও মায়ের পিছন পিছন ক্লাবের দিকে যেতে গিয়ে দেখলো একটা ছোট কাগজের পতাকা পরে আছে মাটিতে।তাড়াতাড়ি তুলে নিলো ছোট ছেড়া পতাকাটা ফিঙে,তারপর বুকে জাপ্টে নিয়ে বললো-"তুমি সারাজীবন এভাবেই উড়তে থাকো ,কখনো নেমো না ওই লাঠিটা থেকে তাহলে আমার আর মায়ের খাওয়ার অভাব হবে না,আমি ইস্কুলেও যেতে পারবো !"
তাকিয়ে দেখলো লম্বা লাঠির মাথায় উড়তে থাকা পতাকাটা প্রায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে। মাইকে তখন গান বাজছে
"তিরঙ্গা পতাকা ওড়ে নিশান
বাতাসে বাতাসে বাজে বিশান
কণ্ঠে এগিয়ে যাওয়ার গান
করেছি উচ্চারণ
বন্দে মাতরম....., বন্দে মাতরম....."
Comments
Post a Comment