15 August 2022



শৃঙ্খল
সোমা নায়ক 

পাখিটার নাম ছিল ময়না,
অবিকল মানুষের ভাষায় কথা বলত।
রূপ যেন তার সুন্দরের মতো, 
আর গুণ ছিল এমনই যেন নিবিষ্ট পূজারী।

সুখ ছিল, তবে শখগুলো গুমরে গুমরে কাঁদত
খোলা আকাশের গায়ে রামধনু আঁকতে চেয়ে
সে গান গাইত একলা খাঁচায়।
হাততালি কুড়নোর লোভ ছিল না তার 
তবু শান্তির লোভে কৃতজ্ঞতায় বধির হয়ে থাকার চেষ্টা করত সবসময়।

ছোলা, পেয়ারা, লাল লাল লঙ্কা দেওয়ার ছলে
বাড়ির নতুন বউটাও রোজ হাত বাড়িয়ে দিত খাঁচার ভেতর।
ময়নার মাথায়, গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করে সে বলত, 

     "ময়না পাখির বুকের খাঁচায় লুকিয়ে আছে দুখ
     স্বাধীনতা কি ভুলেই গেছে, রোজ কিনছে সুখ!
     শ্বাস নেয় সে ভয়ে ভয়ে, কথাটুকু ও লোকের
     ময়না পাখি ভুলেই গেছে, সে ও ছিল নিজের।"

ময়না পাখি নকল করে কথা বলে।
নতুন বউয়ের মনের ভাষা মুখস্থ বলে যায় অবিরাম, গড়গড় করে।
মুখের কথা যেন মনের মধ্যে কেমন ছবি হয়ে এঁটে থাকে তার।
নতুন বউয়েরও গলার স্বরে জোর বাড়ে
রোজ রোজ নতুন গল্প, 
নতুন মন্রোচ্চারণ খুঁজে নেওয়ার অন্তহীন প্রচেষ্টায়
ছুঁয়ে থাকে মুক্তির নতুন নতুন শপথ।

সুখ না চাওয়ার আন্দোলনে
ময়না এখন চুপ
বউয়ের সোহাগে অভিমান হয় তার, বারবার!
গা ঝাড়া দিয়ে মুখ ফিরিয়ে রাখার ছলে মুক্তির স্বপ্ন দেখে সে।
বিপ্লবের আগুনে হৃদয় সেঁকতে গিয়ে
কেঁপে ওঠে বুক।
চোখে নতুন স্বপ্ন আঁকার লোভে দুজন দুজনের দিকে তাকায় নতুন আশায় ।


অদৃশ্য শৃঙ্খলের নাগপাশে বন্দী থাকা মন হাঁসফাঁস করে।
শূন্য খাঁচার দিকে তাকিয়ে নতুন থেকে পুরনো হয়ে যাওয়া বৌটা গুনগুন করে গান ধরে, ''যা পাখি উড়তে দিলাম তোকে.....

স্বপনে যাপনে, নিদ্রায় জাগরণে 
মুক্ত ময়নার মন হানা দেয় হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে! 
দৈনন্দিন রুটিনের মতো সে রোজ এসে বসে 
বন্ধ ঘরের খোলা জানলায়, ঘুলঘুলিতে।
নিজস্ব সুর, নিজস্ব স্বর দিয়ে
সে তার নতুন বউকে স্বাধীনতার সুখের গল্প বলে অনর্গল।
মুক্তির মিষ্টি আস্বাদন ঠিক কেমন হয়
ময়নার অঙ্গ প্রত্যঙ্গে চাক্ষুষ করে বন্দী বউয়ের দীর্ঘশ্বাসও যেন গুমরে গুমরে মরে।

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন - সাধ তো সবারই থাকে 
শুধু সাধ্যিতে কুলোয় না যে সবসময়...


Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির

শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )