শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ৩ )


শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস -

তৃতীয় পর্যায় লেখা শুরু করলাম -

৩ ) শিল্পায়ন কাল -
                 দিনেমার শাসনের শেষের দিকে শ্রীরামপুরের পরিচালন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে। ইংরেজ কোম্পানি শ্রীরামপুরের মালিকানা কবলিত করেই জনসাধারণের সুখ - সুবিধার দিকে নজর দেয়। অবশ্য এ সংক্রান্ত একটি ' ভিলেজ কমিটি ' আগে থেকেই ছিল।এ প্রক্রিয়াতেই শ্রীরামপুর পৌরসভা স্থাপিত হয় ১৮৬৫ সালে। রিষড়া এবং কোন্নগরও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়।

             সে সময় শ্রীরামপুরের সমাজের শিরোমণি ছিলেন উচ্চবর্ণ ও বিত্তশালী শ্রেণির মানুষজন । তাঁদের জীবনধারায় না ছিল কোন আধুনিকতার ছাপ, না ছিল বিন্দুমাত্র নগর মনস্কতার চিহ্ন। এঁরা ছিলেন প্রাচীন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এবং এই সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে আস্থাবান।

           এ সময় সর্বভারতীয় অর্থনীতিতে চলছিল দারুণ দুর্দশা। শ্রীরামপুরেও কাজের সন্ধানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার ও উড়িষ্যা রাজ্যের কৃষি - শ্রমিকরা। ব্রিটিশ মালিকানায় যখন রিষড়ায় প্রথম চটকল(১৮৫৫) এবং শ্রীরামপুরে দ্বিতীয় চটকল (১৮৬৬) স্থাপিত হলো তখন থেকেই বাণিজ্যনগর শ্রীরামপুর রুপান্তরিত হয় শিল্পনগরে । অবশ্য এর মূলে ছিল ১৮৫৪ সালে হাওড়া থেকে বর্ধমান পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া রেলপথ স্থাপন এবং ১৮৬৬ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে রিষড়া, শ্রীরামপুর ও গোন্দলপাড়ায় পরপর ছ'টি চটকল স্থাপন। এই সময় চটকলের সঙ্গে এ অঞ্চলে অন্যান্য কারখানাও গড়ে উঠতে থাকে। স্থানীয় ভূস্বামী, ঠিকাদার ও কারখানা মালিকগণ বাইরে থেকে আসা অবাঙালি শ্রমিকদের বসবাসের জন্য স্থান বরাদ্দ করেন। এ সকল বহিরাগত শ্রমিকের আগমনে ১৮৭২ সাল থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে শ্রীরামপুরের লোকসংখ্যা ২৪,৪৪০ থেকে ৪৪,৪৫১ - তে উন্নীত হয়। শ্রমিকরা বসবাস করার মতো ঠাঁই পেলেও তাদের বাসস্থান ছিল অস্বাস্থ্যকর, ঘিঞ্জি,আলো - বাতাসহীন এবং গন্ধময়। সামান্যতম নাগরিক সুখ - স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থাও সেখানে ছিল না।

             ১৯১৪ সালে পৌর প্রতিষ্ঠান থেকে পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হয় কিশোরী লাল গোস্বামীর স্মৃতিকল্পে টাউন হল। ত্রিশের দশকে সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত হয় উইভিং স্কুল। পৌর প্রতিষ্ঠান থেকে বৈদ্যুতিক পরিষেবা চালু হয় ১৯৩৮ সালে। ব্রিটিশ রাজের শাসনের পঞ্চাশ বছর পর শ্রীরামপুরে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয় আন্দোলনের ঢেউ এসে পড়ে। স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষিত হন বহু মধ্যবিত্ত পরিবারের যুব সম্প্রদায়। নতুন ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে এ আন্দোলনে যোগ দেন। স্বভাবতই বিদেশী শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগে ভাটা পড়ে ও স্বদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। স্বদেশী উদ্যোগে প্রথম কাপড়ের কল বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিল স্থাপিত হয়।বিশ শতকের গোড়া থেকেই শ্রীরামপুরে বহু পাঠশালা, স্কুল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। প্রাচীন বনেদি বংশের কেউ কেউ জনকল্যাণে তাদের বসতবাড়িও দান করে।

সংগৃহীত
কলমে - স্বপ্না ব্যানার্জী
পরের ভাগে  - শ্রীরামপুরের বর্তমান কাল পাবেন।

Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির

শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )