শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ২ )


শ্রীরামপুর এর ইতিহাস - 

দ্বিতীয় পর্যায় লেখা শুরু করলাম -

২) নগরায়ণ কাল -
              প্রায় একশত বছরের এই পর্যায়কাল শুরু হয় দিনেমারদের ভূমি অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে ।দিনেমার কোম্পানি আঠারো শতকের মাঝামাঝি তে দক্ষিণ ভারতের ট্যাঙ্কোবার কুঠি থেকে সোয়েটম্যন নামে একজন প্রতিনিধি কে বাংলার নওয়াবের কাছে পাঠায় । তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলায় বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করা । নওয়াব আলীবর্দী খান কে নগদ ৫০ হাজার মুদ্রা ও প্রচুর উপহার এর বিনিময়ে সোয়েটম্যান বানিজ্য করার আদেশ পান। ১৭৫৫ সালে সোয়েটম্যন এক লক্ষ আশি হাজার টাকায় শ্রীপুরে তিন বিঘা ও আকনায় সাতান্ন বিঘা জমি কিনে কুঠি - বন্দর স্থাপন করেন।এরপর ই দিনেমাররা শ্রীরামপুর, আকনা ও পিয়ারাপুর মহল বার্ষিক ১৬০১ টাকা খাজনায় শেওড়াফুলির জমিদারদের কাছ থেকে নিয়ে নেয় ।এই ভাবে মোট ১৬৮০ বিঘা জমি সংগ্রহ করে তাদের কারখানা কে খড়ের ছাউনি দিয়ে,একটি বিশাল পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেয় । উত্তর সীমানা বরাবর পিয়ারাপুর অবধি খাল খনন করে। ডেনমার্কের পঞ্চম ফেডরিকের নাম অনুসারে সদ্য কেনা জায়গার নাম দেন ফেডরিক্সনগর। এভাবে শ্রীরামপুর দিনেমার কুঠির পত্তন হয়। তবে এটি ছিল একান্তভাবেই পণ্য আমদানি - রপ্তানির একটি কেন্দ্র।


              প্রথম দশ - পনেরো বছর দিনেমার বণিকরা নানা ধরনের প্রতিকুলতার সম্মুখীন হয়। ১৭৭০ সালের পর থেকে বাণিজ্য ক্ষেত্রে তাদের উন্নতি শুরু হয়। প্রধানত দুটি উপায়ে এ উন্নতি আসে,যথা - (১) অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের পণ্য সামগ্রী রপ্তানির মাধ্যমে এবং (২) কর্নেল ওলেবাই কতৃক সুদক্ষরূপে প্রশাসন পরিচালনার মাধ্যমে।১৭৭৬ সালে কর্নেল ওলেবাই প্রশাসক হিসেবে শ্রীরামপুরের দায়িত্বভার গ্রহণের পর তাঁর দুরদর্শিতা, দক্ষ পরিচালনা ও কুটবুদ্ধি দিনেমার ব্যবসা - বাণিজ্যের প্রভূত উন্নতি ঘটায়। তিনি শ্রীরামপুরে নগরায়ণের ধারাকে বেগবান করে তোলেন। ক্রমেই এ নগরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে এবং কিছু বিদেশী বণিক ও দেশী ব্যবসায়ী এখানে এসে বসবাস শুরু করেন।
                 দিনেমার কম্পানি প্রথম দিকে এজেন্ট, দালাল ও বানিয়াদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে ব্যবসা চালাত। পরের দিকে কম্পানি সরাসরি উৎপাদকের কাছ থেকে পণ্য - সামগ্রী কেনা শুরু করে।উৎপাদককে দাদন দিয়ে উৎকৃষ্ট পণ্য তৈরিতে তারা উৎসাহিত করত ।তারা আকনা ও মোহনপুরের তাঁতীদের আগাম অর্থ দিয়ে সংগ্রহ করতো কোরা কাপড় ও উৎকৃষ্ট রেশমবস্ত্র। এছাড়া জাহাজের 'হামারকাতা' ও 'লাকলাইন' কাছি, বিভিন্ন ধরনের দড়ি এবং কৃষিজ পণ্যও সংগ্রহ করা হতো।পিয়ারাপুর মৌজায় চাষিদের দিয়ে ধান ছাড়াও নীল চাষ করানো হতো। তাছাড়া দিনেমার বণিকরা নিজেরাই কাপড়ের কারখানা স্থাপন করে উৎকৃষ্ট বস্ত্র তৈরি করতে শুরু করেন। দিনেমারদের আয়ের অপর প্রধান উৎস ছিল হুন্ডি ব্যবসা । অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের পণ্য নিজেদের জাহাজে করে রপ্তানির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনসাধারণের উপর বিভিন্ন প্রকার কর ও খাজনা আরোপ ইত্যাদিও তাদের আয়ের উৎস ছিল।

         কর্নেল ওলেবাই যেমন আইন - শৃঙ্খলা, শাসন - ব্যবস্থা, ব্যবসা - বাণিজ্যের দিকে যত্নবান ছিলেন, তেমনই শ্রীরামপুর নগর কে মনোরম ও চিত্তাকর্ষক করার দিকেও তাঁর দৃষ্টি ছিল। তিনি গঙ্গা নদীর কূল ঘেঁষে পিচ ঢালা পথ , আকর্ষণীয় দালান - বাড়ি , পান্থ - নিবাস এবং স্থানে - স্থানে পার্ক , বসবার যায়গা প্রভৃতি নির্মাণ করেন।

           ঊনিশ শতকের প্রাক্কালে তিনজন ইউরোপীয় ব্যাপটিস্ট মিশনারি উইলিয়াম কেরী,যশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের শ্রীরামপুরে আগমন এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একথা বলা যেতে পারে যে , এঁরাই শ্রীরামপুরে নবজাগরণের স্রষ্টা। এই তিন মিশনারি খ্রিস্টধর্ম প্রচারের পাশাপাশি শ্রীরামপুর ও আশেপাশের পীড়িত ও আর্ত মানুষজনের সেবা, স্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। শ্রীরামপুরের পার্শ্ববর্তী বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে শতাধিক মিশনারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। হ্যানা মার্শম্যান স্থাপন করেন প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। কিন্তু উইলিয়াম কেরী ১৮০০ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস স্থাপন করে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তির স্বাক্ষর রাখেন, যেখানে পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি কাঠের হরফ ব্যবহূত হতো।১৮১৮ সালে কেরী ও তাঁর দুই সহকর্মী তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ ব্যয়ে নির্মাণ করেন শ্রীরামপুর কলেজ।এটি এশিয়ার মধ্যে প্রথম ডিগ্রি কলেজ।কেরী বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। বাইবেলের বাংলা অনুবাদ, হিতোপদেশ ও কথোপকথন নামে তিন খানা পুস্তক ছাপা হয় মিশন প্রেস থেকে।কেরীর মুন্সী রামরাম বসু প্রকাশ করেন প্রতাপাদিত্য চরিত, রামায়ণ ও মহাভারতের বাংলা অনুবাদ। কেরীর সম্পাদনায় ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষায় রচিত দ্বিতীয় সাপ্তাহিক সংবাদ পত্র সমাচার দর্পণ।একই সময়ে ফ্রেন্ডস অব ইন্ডিয়া নামে আর একটি সংবাদ পত্র ইংরাজী তে প্রকাশিত হয় শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে। মিশনারিদের আর একটি অবদান হলো শ্রীরামপুরে ভারতের প্রথম বাষ্পীয় কাগজ কল স্থাপন করা। ১৮০১ - ১৮৩২ সালের মধ্যে শ্রীরামপুর প্রেস থেকে ৪০ টি ভাষায় মোট ২,১২,০০০ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই সকল উন্নয়নে শ্রীরামপুরের স্থানীয় জনসাধারণ প্রায়শই নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। মিশনারিদের জনশিক্ষা বিস্তার , প্রকাশনা সংক্রান্ত কাজকর্ম বা সমাজ সংস্কারমূলক যে কোন ধরনের কাজে শ্রীরামপুরের  অভিজাত - অনভিজাত নির্বিশেষে প্রায় সকলেই দর্শকের ভূমিকা পালন করতেন। অবশ্য কিছু কিছু ভূস্বামী, অনাবাসী জমিদার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী খুবই  আগ্রহী ছিলেন নিজ নিজ সন্তানদের ইংরেজি শিক্ষায় পারদর্শী করতে।তারা মিশনারিদের প্রবর্তিত এই উচ্চ শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করেন। নিম্নবিত্তের মানুষজনেরাও মিশনারি স্কুলে তাদের সন্তানদের পাঠিয়ে বুনিয়াদি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন। এভাবে মিশনারিদের প্রতি একটি সন্তুষ্ট শ্রেণিও সমাজে গড়ে ওঠে।

          ১৮০১ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যে দিনেমারদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শ্রীরামপুরের নাগরিক জীবনযাত্রায় নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ১৮০০ সালে যেখানে ১১৩ টি জাহাজ শ্রীরামপুর বন্দরে মাল বোঝাই ও খালাস করে , সেখানে ১৮১৫ সালে গিয়ে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র একটিতে। কলকাতায় অবস্থিত ইংরেজ কোম্পানির বণিকদের ক্রমাগত অত্যাচার ও আগ্রাসী মনোভাব দিনেমার কম্পানির মূলে আঘাত হানে। অবস্থা এমনই দাড়ায় যে, ১৮৩৫ সালে ১১ অক্টোবর গভর্নর পীটার হ্যানসেন ইংরেজদের কাছে তাঁদের কেনা সমুদয় সম্পত্তি মাত্র সাড়ে বারো লক্ষ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন ।

সংগৃহীত
কলমে - স্বপ্না ব্যানার্জী
( চলবে )

Comments

Popular posts from this blog

কানপুরের জগন্নাথ মন্দির

শ্রীরামপুর - এর ইতিহাস ( ভাগ - ১ )