স্বামী বিবেকানন্দ
শিরোনাম-- মনের মণিকোঠায় বিবেকানন্দ ।
কলমে-- মীনা রায় বন্দ্যোপাধ্যায়
[ লেখক পরিচিতি : শ্রীরামকৃষ্ণদেব, মা সারদা ও স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী পাঠে আনন্দিতা মীনা রায় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পাড়া শ্রীরামপুর সারদাপল্লীতে চাতরা , সারদাপল্লী, শ্রীরামকৃষ্ণ সেবায়তন মন্দির নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ]
বিবেকানন্দ! নামটি উচ্চারণ করে অনুভব করতে হয়। কি অমোঘ অর্থ! বিবেক +আনন্দ। অর্থাৎ আনন্দময় বিবেক। বিবেক আর আনন্দ এ দুটিই অদৃশ্য অনুভূতি। অদ্ভুত উপলব্ধির বিষয়। আপাত অদৃশ্য বটে ,তবে ব্যক্তির ব্যক্তিত্বে ছাপ ফেলে । এক অপরূপ সৌন্দর্য প্রকাশিত হয় ব্যক্তির অবয়বে।চলনে বলনে মানুষকে মহামানব করে তোলে এই উচ্চারণ। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই জ্ঞানদীপ্ত আঁখি , উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব, পরম সুন্দর সুমধুর কন্ঠস্বর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পরম প্রিয় পার্ষদ নরেনকেই মনে পড়ে।
যাঁকে প্রথম দর্শনেই শ্রীরামকৃষ্ণ দেব বলেন --সপ্তর্ষি মন্ডলের অন্যতম ঋষি। দর্শনে প্রথম বিভাগে প্রথম সিমলের নরেন জানতে গেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে ঈশ্বর কি আছেন?উত্তরে আছেন জেনে পরবর্তী প্রশ্ন আপনি ঈশ্বরকে দেখেছেন?
উত্তরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ জানান -তিনি দেখেছেন। এমনকি যেমন নরেনের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি তেমনও বলেছেন। নরেন বুঝলেন ঠিক মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন। তবুও সন্দিহান। ঠাকুর তাঁকে অত্যন্ত স্নেহে আপন করে নেন।নরেন তাঁকে গুরু রূপে শ্রদ্ধা করেন।নরেন বিশ্বে অবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আধ্যাত্মিক অবদান সনাতন হিন্দুধর্ম যে সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথাই বলে সেই বাণী প্রচার করেছেন। উপলব্ধি করেছেন যা তাই জীবনে কাজে লাগিয়ে নরেন হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। জীবে প্রেম করে যেইজন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। বিবেকানন্দ উপলব্ধি করে নরনারায়ণ সেবায় আত্ম নিবেদন করেন। ১৮৯৩ সালের ১১সেপ্টেম্বর বিশ্ব ধর্ম মহাসেম্মলনে স্বামীজী হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। হে আমার আমেরিকাবাসী ভাই -বোনেরা ! --এই সম্বোধন করে মানুষকে মোহিত করেন।সভার সকলে করতালি দিয়ে বিবেকানন্দকে অভিবাদন জানান। বিদেশিনী ভগ্নি নিবেদিতা তাঁর মানসকন্যা সুযোগ্যা শিষ্যা। তিনি ভারতবাসীর সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে স্বামীজি ও নিবেদিতার অবদান অস্বীকার করা যায় না।
ভারতবর্ষে প্লেগ মহামারী আকার ধারণ করলে নিবেদতা সেবাধর্মে মানুষকে শুশ্রূষা করেছেন।
ছোটবেলায় স্বামীজি খুব সাহসী ছিলেন। ভূত প্রেত বম্ভদৈতির ভয় ছিল না বালক নরেনের।
তাঁর পিতা আইনজীবি বিশ্বনাথ দত্ত এবং মাতা ভুবনেশ্বরীদেবী খুব দয়ালু ও দানশীল ছিলেন। পৈতৃক ভিঁটেবাড়ি পূর্ব বর্ধমান জেলার দত্তদাড়িয়াটন গ্রামে।
বিশ্বনাথ দত্তের মৃত্যুর পরে আর্থিক অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয় নরেনকে। তিনি দিক্ষণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে জানান।তিনি তাঁকে মন্দিরে মা ভবতারিণীর কাছে ধন সম্পদ চেয়ে নিতে পাঠালেন।নরেন মায়ের কাছে গেলেন, চাইলেন --মা শুদ্ধ ভক্তি দাও,বিবেক দাও মা।ব্যাস্ ! পরিণামে হলেন বিবেকানন্দ।
শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের অরিত্রিক ভজন ও স্তোত্র তিনি লিখেছেন--"খন্ডন ভব বন্ধন জগ বন্দন বন্দি তোমায় !"
"ওঁম হৃং ঋতং তমচলো গুণজিৎ গুণেঢ্য।" এ গুলো নিত্য সন্ধ্যায় বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত বেলুড়মঠে ভজনা করা হয়।
শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের দেহবাসনের পরে প্রেমানন্দ বাবুরাম মহারাজের পিত্রালয় আঁটপূরে ২৪ডিসেম্বর রাতে ১২ জন সন্ন্যাসী ধূনী জ্বালিয়ে প্রতিশ্রুত হন---- শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আধ্যাত্মিক মহিমা ভাবধারা তাঁরা ধরে রাখবেন জগতে। এরপর বরানগরে একটি ছোট বাগানবাড়ির ঘরে তাঁরা বহূ কষ্টে যাপন করেন দিন রাত।ভিক্ষান্ন জুটলেও লবণ বোধহয় জোটে না।বস্ত্র অভাবে বাইরে ভিক্ষা করতে বেরোনো অসম্ভব হয়েছিল।
এরপরে ঠাকুরের কৃপায় বেলুড়ে নীলাম্বাবর বাবুর গানবাড়িতে মা সারদাকেও নিয়ে যান।গুরুপত্নী হলেন জগন্মাতা মা সারদা। পরবর্তীতে বেলুড় মঠের জমি কেনা ও মঠ গঠন। আজ বিশ্বব্যাপী শ্রীরামকৃষ্ণদেবেরভাব প্রচার আশ্রম মঠ ছড়িয়ে আছে।
১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি বিবেকানন্দের জন্ম। দিনটি ভারতবর্ষে যুবদিবসরূপে পালন করা হয়।স্বামীজী গীতাপাঠে আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শারীর গঠনের জন্য যুবসমাজকে ফুটবল খেলতে বলেছেন।শরীর ও মনের গঠনেই সামগ্রীক ভাবে দেশের কাজে লাগা সম্ভব। ১৯০২ সালে ৪ ,জুলাই স্বামীজির দেহাবসান ঘটলেও তাঁর অমর আদর্শে তিনি আপামর বিশ্ববাসীর হৃদয়ে চিরভাশ্বর । ঠাকুর ,মা ও স্বামীজি আজ মানুষের হৃদয় মন্দিরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন শুধুমাত্র মানুষজনের মঙ্গল ও ভালোবাসার মাধ্যমে।
Comments
Post a Comment