Mahalaya
মাতৃ-পক্ষ
সুজান মিঠি
“ইত্থং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি ।।
তদা তদাবতীর্যাহং করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম্ ।।”
ওই যে গঙ্গায় উপচে পড়ছে ভিড়…
পিতৃপক্ষের অবসান তিথিতে পূর্বপুরুষের জন্য
তর্পণে ব্যস্ত পুত্র, প্রপৌত্র…
ঠিক তার পাশটিতে ওই যে বধূটি কান্নায় ভিজিয়ে
নিচ্ছে গালের কালশিটে
ওখানে তুমি কোথায় মা?
আকাশ ঘন নীল। বৃষ্টির পরে তরতাজা গাছ।
কাটছে...কাটছে
গাছটার মূল কাটছে
পাতা কাটছে
পাতা থেকে সালোকসংশ্লেষ
তারপর মৃত কাঠ …
দাউদাউ জ্বলে ওঠা আগুন
তারপর ছাই।
ওখানে তুমি কোথায় মা?
রোজ বিকেলে ছোট্ট এক স্বপ্ন আঁকত
যে দুটো হাত একসঙ্গে
হারিয়ে যেত পাখির মত,
ফুলের মত
ওদের কুচি কুচি করে নদীর স্রোতে ঢেলে দিল
যে অনার কিলিং
ওখানে কোথায় তুমি মা?
মাতৃপক্ষের শুভ সূচনা হচ্ছে আজ
ঠাকুরদার রেডিওর উপরে দুটো শিউলি,
ধুপ আর একটানা বীরেন ভদ্র।
মায়ের চোখে আলো
পুজো আসছে!
ঠাকুরদার এঁটো কাপ ধুয়ে শিউলিতলায়
কুড়িয়ে নেয়…
"বাজলো তোমার আলোর বেনু" সুর।
কিন্তু ওই শিউলিতলায় তুমি কই মা?
অষ্টমীর অঞ্জলি শেষে কেয়া'র লাল গরদের
শাড়ি রক্তে মাখামাখি…
গণধর্ষণের পরে গলায় ফাঁস
হাতে শক্ত করে ধরে রাখা তোমার আশীর্বাদ।
ওখানে তুমি কই মা?
ঠাকুরদার রেডিওর আওয়াজ ভেসে যাচ্ছে
বাতাসে, প্রশ্বাসে…
"অভয়া শক্তি, বলপ্রদায়িনী, তুমি জাগো।"
কিন্ত কে জাগবে এই মহালয়ার পুণ্য প্রভাতে?
কী করে জাগবে?
তুমি কোথায় মা?
মুহূর্তেই আমার রাগী বাবার ঘুম ভাঙল।
মায়ের উপর রাগ হল কী এক অজানা কারণে যেন
শিউলি কোঁচড়ে মা ফিরছিল ঘরে
গালে ছিল আলোর গান
বাবা দিল থাপ্পড়…
আমার মায়ের আলোর গান খুলে পড়ল মাটিতে
শিউলি গড়াগড়ি খেল রাগে
আমার মায়ের চোখ জ্বলে উঠল প্রথমবার
হাতের শাঁখা গুটিয়ে নিয়ে বাবার গালে দিল পাল্টা সপাট!
নদীর পারে দুলছে কাশ
এইতো শুরু মায়ের মাস!
মা পড়ে যাওয়া শিউলি তুলতে তুলতে ভীত অথবা বিস্মিত বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
চা দেব এবার?
ঠাকুরদা মাকে কাছে ডাকলেন,
বললেন, বোস মা! বীরেনবাবু কী পাঠ করছেন
শোন…
"যা চণ্ডী মধুকৈটভাদিদৈত্যদলনী যা মাহিষোন্মূলিনী
যা ধূম্রেক্ষণচণ্ডমুণ্ডমথনী যা রক্তবীজাশনী ।
শক্তিঃ শুম্ভনিশুম্ভদৈত্যদলনী যা সিদ্ধিদাত্রী পরা
সা দেবী নবকোটীমূর্তিসহিতা মাং পাতু বিশ্বেশ্বরী।।"
ঠাকুরদা আমায় বললেন,
এখন পেয়েছিস তো তোর মাকে?
মাতৃপক্ষের সূচনা হয়েছে যে রে আজ!
এ পক্ষ চলুক অনন্তকাল…
রক্তবীজ ভক্ষণ করুন মা।
ধারণ করুন পৃথিবী
সংহার করুন প্রলয়!
বীরেনবাবুর উচ্চারণ ছড়িয়ে পড়ছে
কালশিটে মুছে উঠে দাঁড়ানো বধূটির চোখে,
আগুন পোড়া ছাইয়ের চোখে...
স্রোতে ভেসে যাওয়া অনার কিলিংয়ে...
কেয়ার লাল গরদে…
"ত্বয়ৈব ধার্যতে সর্বং ত্বয়ৈতৎ সৃজ্যতে জগৎ ।
ত্বয়ৈতৎ পাল্যতে দেবি ত্বমৎস্যন্তে চ সর্বদা ।।"
ওই প্রলয় আসছে!
ওই ঘনিয়ে আসছে মায়েরা!
ওই জগৎ সৃষ্টিকারী গর্ভ চিরে
উৎপত্তি হচ্ছে…
মায়ের তেজদীপ্ত কন্ঠ…
"...অহং জনায় সমদং কৃণোম্যহং
দ্যাবাপৃথিবী আবিবেশ।।"
---------------
15. 08. 2021
Comments
Post a Comment